ভিসানীতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সমর্থনের অংশ

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নতুন ভিসানীতির ব্যাখ্যায় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের অংশ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে এ কথা বলেন তিনি।

ওই বৈঠক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি সম্পর্কে ড. মোমেন বলেন, ভিসানীতি সুষ্ঠু নির্বাচনে কতদূর সাহায্য করবে তা জানি না। তবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নতুন যে ভিসানীতির ঘোষণা দিয়েছে, তা নিয়ে সরকার কোনো চাপে নেই।

এর আগে গতকাল দুপুরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি নিয়ে আলোচনা করতেই পিটার হাস পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেন তারা।

বৈঠক প্রসঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। মাঝেমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়, এটি তারই অংশ। আমরা দুই দেশের সম্পর্ক আরও কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৈঠকে নতুন ভিসানীতি নিয়েও কথা বলেছি। যেটি গতকাল (বুধবার) যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আমরা নতুন ভিসানীতি করেছি। বাংলাদেশের মানুষ, সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও সবার জন্য এটি সহায়ক হবে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্যও ঘোষিত নতুন ভিসানীতি সহায়ক হবে।’

পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য যে ভিসানীতি করেছে, তাতে আমরা আশা করছিÑ আমরা যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চাই, বিশেষ করে, আমরা তো জ্বালাও-পোড়াও চাই না, এটা সাহায্য করবে। এ কারণে (ভিসানীতি) হয়তো যারা জ্বালাও-পোড়াও করে নির্বাচনকে বানচালের চেষ্টা করে তারা হয়তো তার প্রেক্ষিতে বিরত থাকব। তবে আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই।’

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ ভিসানীতি গ্রহণ করা হয়েছে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাদের আমি রিজেক্ট (বাতিল) করব কেন? আমাদের যেগুলো অঙ্গীকার, আমরা যেটি চাই তাদের পলিসিতে সেটিরই পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আমাদের কোনো অস্বস্তি নেই। তারা করেছেন তাদের নিয়মে। এটি যদি অবাধ ও সুষ্ঠু সহায়তা করে, তাহলে ভালো। তবে আমি নিশ্চিত নই। কারণ এটার কোনো পরীক্ষা আগে হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে ড. মোমেন বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চেয়েছি, এ ভিসানীতি পরীক্ষিত হয়েছে কি না। তিনি জানিয়েছেন, এটা পরীক্ষিত হয়নি। এটা তাদের নতুন নীতি। তারা আশা করে, এটা বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হবে। তারা নাইজেরিয়া, সোমালিয়াসহ কয়েকটি দেশে করেছে। এটি তাদের নতুন প্রচেষ্টা। এর ফলে কোথাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে কি না জানতে চেয়েছিলাম। রাষ্ট্রদূত বলেছেন, এটা এখন বলা যাবে না।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য কাজ করেছে। মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্যই আওয়ামী লীগ। সারা জীবনই নির্বাচনের জন্য কাজ করেছে দলটি। আমাদের দেশে যদি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হয়, সেই সরকার টিকতে পারে না। একটা হয়েছিল বিএনপির সময়, তারা গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় টিকতে পারেননি। আমাদের দেশের মানুষ নির্বাচনমুখী। আমরা সব সময়ই চাই অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হোক। আমরা জ্বালাও-পোড়াও গ্রহণ করব না। মানুষ নির্যাতিত হোক, মারা যাক, সেটি আমরা গ্রহণ করব না। আমরা চাই না, রাস্তাঘাট বন্ধ করে সমাবেশ হোক।’

নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি ঘোষণা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো কি নাÑ এ প্রশ্নের জবাবে ড. মোমেন বলেন, ‘এটা আমি বলতে পারব না। আপনারা বিশ্লেষণ করেন। তাদের একটা ভাবনা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের যাতে উন্নয়ন হয়, সেটি করা। তারা চেষ্টা করুক। তাদের দেশেও তো নির্বাচনী ঝামেলায় মানুষ মারা গেছেন। আমেরিকার ৭৫ ভাগ রিপাবলিকান মনে করেন গত নির্বাচনে ভোট কারচুপি হয়েছে। সর্বদলীয় ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করে তাদের নির্বাচনে দুর্বলতা আছে। কোনো দেশেরই নির্বাচন পারফেক্ট না।’

এদিকে, পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদ ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ এ আরাফাত, বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ এবং জাপার পক্ষে দলের মহাসচিব মজিবুল হক চুন্নু এবং সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর গুলশানে রাষ্ট্রদূতের বাসায় এই বৈঠকে অন্যদের মধ্যে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কাউন্সিলর স্কট ব্র্যান্ডন, পলিটিক্যাল অফিসার ম্যাথিউ বেও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে বেরিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি।

এ বৈঠকের পর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের আমীর খসরু বলেন, ‘আগামী নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতিকে আমরা স্বাগত জানাই। কারণ বাংলাদেশে এ মুহূর্তে মানুষের নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কা, আমি মনে করি এ ধরনের একটি পদক্ষেপ আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের ভোট কারচুপির চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সিগন্যাল বলে মনে করি আমরা।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতিকে স্বাগত জানিয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাপা। বৈঠকের ব্যাপারে জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দলের পক্ষ থেকে বলেছি, যেহেতু আমেরিকার সরকার বাংলাদেশে যেন একটা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হয়, সেজন্য এই ভিসানীতি করেছে, সে উদ্দেশ্যটা ভালো। সুষ্ঠু নির্বাচনে যারা বাধা দেবে, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করবে বা অন্যকিছু করবে, তাদের আমেরিকা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো আমেরিকার সরকার আন্তরিকভাবে চায় বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। যেহেতু তাদের উদ্দেশ্যটা ভালো, তাই দলের পক্ষ থেকে তাদের এই নীতিটাকে স্বাগত জানাই।’

জাপা মহাসচিব আরও বলেন, ‘আমরা আরও বলেছি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি বড় দল। তারাসহ সব রাজনৈতিক দল যদি সংলাপে না বসে, তাহলে নির্বাচনসহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যেসব তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে, সংকট দেখা দিয়েছে, সেগুলোর কোনো সমাধান হবে না।’

জাপা মহাসচিব বলেন, বৈঠকে অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি। শুধু ভিসানীতি নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তিন পার্টির দুজন করে দাওয়াত করেছিল। রাষ্ট্রদূত ভূমিকাতে তাদের ভিসানীতি ও সেখানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গটুকু বলেছে। পরে এ বিষয়ে দলগুলোর মতামত জানতে চাইল।

মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, বৈঠকের ভূমিকাতে পিটার হাস বলেছেন, এই নির্বাচনের বিষয়ে তারা এই ভিসানীতি করেছে। তারা চায় সব দেশেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন। এর আগেও অনেক প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন যাতে যথাযথ সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, সেজন্যই এমন ভিসানীতি করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে যারাই বাধা দেবে বা প্রভাব বিস্তার করবে, তারা যেই হোক, নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত জুডিশিয়ারি, পুলিশ, অ্যাডমিন, পলিটিক্যাল বা পৃথকভাবে কেউ, তাদের ব্যাপারে কোনো প্রমাণ পেলে তাদের আমেরিকার ভিসা দেওয়া-না দেওয়া এবং তাদের মধ্যে যারা সেখানে আছে, তাদের ভিসাও বাতিলের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করবে।’

জাপা মহাসচিব জানান, তিন দলের বৈঠক একসঙ্গেই হয়েছে। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে ঘরোয়া পরিবেশে চা খেতে খেতে সবাই সামনাসামনি আলোচনা করেছেন। দুপুর ১২টার দিকে শুরু হওয়া বৈঠক পৌনে ২টার দিকে শেষ হয়েছে।