নাগরিক আন্দোলনের বলিষ্ঠ কণ্ঠ

শৈশব থেকে এলাকার মাদক, জলাবদ্ধতা, গ্যাস ও পানির সংকট, বেহাল সড়ক দেখে বড় হয়েছেন। দেখেছেন খেলার মাঠ নেই, টেকসই আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় নগর সংস্থার নিদারুণ অমনোযোগ। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে এমন অবহেলা, বঞ্চনা কিংবা মাদকের ভয়ংকর বিস্তার ছোটবেলা থেকেই যাকে প্রতিবাদী করে তুলেছিল এবং এখনো যার প্রতিবাদ জারি আছে তিনি হলেন মিজানুর রহমান।

পুরান ঢাকার পূর্ব জুরাইন অবহেলিত এক জনপদ। এখানে সুপেয় পানি ও গ্যাসের সমস্যা প্রকট। জলাবদ্ধতা ও এডিস মশার উপদ্রবেও নাকাল মানুষ। প্রায় ৫০ বছর আগে ওই জনপদে জন্ম নেন মিজানুর রহমান।

কৈশোর থেকে শুরু তার সমাজসেবা ও নাগরিক সেবার আন্দোলন। প্রথমে বন্ধুবান্ধব নিয়ে এলাকায় মাদকবিরোধী প্রচার ও রক্তদান কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর ছোট্ট পরিসরে আন্দোলন। ধারাবাহিক নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন তাকে দেশব্যাপী পরিচিত করে তুলেছে। চলার পথে নানা হুমকি, মামলা, পুলিশি হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন; তবুও লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন। দেশের মানুষ তাকে চেনেন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে। 

মিজানুর রহমান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা একজন মানুষ। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। টানাটানির সংসারে লেখাপড়ার ভিত দুর্বল ছিল; শৈশবে বড় ভাইয়ের সঙ্গে অন্যের দোকানে কাজ করেছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা করে উচ্চমাধ্যমিকের চৌহদ্দি পার হয়ে স্নাতক (পাস) শ্রেণিতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। তবে শেষ করা হয়নি। মিজানুর পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মৌসুমি বিভিন্ন ফলের ব্যবসা করেন। তিন মেয়ের বাবা মিজানুরের সংসার চলে ব্যবসার পাশাপাশি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দোকান ভাড়া ও স্ত্রীর বাড়ি বাড়ার টাকায়।

আরও জানা যায়, কৈশোরে নাগরিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া মিজানুর ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় এলাকায় মাদকবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। এ কাজে নানা হুমকি পেয়েছেন। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। নাগরিক অধিকার আদায়ে সহায়ক হবে ভেবে রাজনীতিতে যুক্ত হলেও শেষমেশ তার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ১৯৯৮ সালে রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত হন।

মিজানুর দেশ রূপান্তরকে বলছিলেন, ‘জনসেবা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার মানসিকতা থেকে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম, মানুষের কথা কেউ বলে না। ব্যক্তিস্বার্থ বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় সেখানে। এ জন্য রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। সে সময় কিছু অফারও ছিল; কিন্তু সেসব আমায় টানেনি।’

তিনি বলেন, তার নাগরিক আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা প্ল্যাটফর্ম নেই। প্রধানত পূর্ব জুরাইন এলাকার সমস্যা সমাধানে বেশি কাজ করেন। এ ধরনের আন্দোলন পূর্ব জুরাইন নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে করা হয়। এর বাইরে ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সঙ্গে কাজ করেছেন। ঢাকা থেকে বিবিয়ানা লংমার্চে যোগ দিয়েছেন। তবে এখন পূর্ব জুরাইন এলাকার নাগরিক সমস্যা সমাধানের বিষয়েই বেশি সোচ্চার।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি যে বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন করছি, এগুলো এলাকার সমস্যা ও নাগরিকদের পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কেননা, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো তার বিনিময়ে মাস শেষে বিল আদায় করছে। আমাদের এলাকায় অনেক শিক্ষিত ও ভালো মানুষ রয়েছে; কিন্তু তারা এসব নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করছেন না। এ জন্য আমি মাঠে নেমেছি। এ কাজগুলো অন্য কেউ করে দিলে আমি এ কাজে মনোযোগী হতাম না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেসব ভালো মানুষ অন্যায় ও অপরাধ দেখেও প্রতিবাদ না করে চুপ করে থাকেন, তাদের আমি ভালো মানুষ বলতে চাই না। কেননা, তারা সোচ্চার হলে খারাপ মানুষগুলো সমাজে এভাবে জেঁকে বসতে পারত না।’

তিনি মনে করেন, ‘সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের জন্য কথা বলার লোক থাকতে হবে। যাদের অনুসরণ করে নতুন প্রজন্ম সেই সব কাজে আগ্রহী হবে। এখনকার সময়ে আমরা সমাজে এমন লোক খুঁজে পাচ্ছি না। খারাপগুলো সমাজে প্রভাব বিস্তার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করছে; আর তথাকথিত ভালো লোকগুলো চুপ করে বসে রয়েছে।’

মিজানুরের নাগরিক আন্দোলন : ২০১২ সালে পূর্ব জুরাইনে জলাবদ্ধতা, ঢাকা ওয়াসার দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি ও গ্যাসের নিম্নচাপসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন। ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পূর্ব জুরাইন নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে এ আন্দোলন করেন তারা। ওই সময় তিতাস গ্যাস কোম্পানি ও ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে লিখিতভাবে জানান।

২০১২ সালে সড়কে নিম্নমানের কাজের জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারের কাজ বন্ধ করে দেন মিজানুরসহ কয়েকজন। ওই ঘটনায় তৎকালীন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের অনেক হুমকি-ধমকি দিয়েছিলেন। একই বছর পূর্ব জুরাইনের ৩০০ মিটার সড়ক তাদের চেষ্টায় জলাবদ্ধতা মুক্ত হয়েছিল। ওই সড়কটি ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর হাঁটুসমান পানির নিচে তলিয়ে থাকত। কাউন্সিলর, সংসদ সদস্যসহ কেউ সমাধানে এগিয়ে আসেননি। ২০১২ সালে মিজানুর ও তার বন্ধুরা মিলে চার দিনে নিজেরা কাজ করে ওই জলাদ্ধতা নিরসন করেন।

দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহের প্রতিবাদে ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসায় গিয়েছিলেন। সংস্থার তৎকালীন এমডিকে ওই দুর্গন্ধযুক্ত পানির শরবত খাওয়াতে চেয়েছিলেন জুরাইন এলাকার লোকজন। ওই আন্দোলনেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মিজানুর রহমান। সে সময় ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে পানি সমস্যার সমাধান করে ওই এলাকায় গিয়ে বিশুদ্ধ পানির শরবত খেয়ে আসার প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছিল। তিন বছর অতিবাহিত হলেও ওই এলাকার পানির সমস্যার সমাধান হয়নি। শরবত খেতেও যাননি ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা। উপরন্তু প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। প্রায় এক যুগ ধরে দূষিত পানি ব্যবহার ও পানি কিনে পান করছে ওই এলাকার প্রায় ১০ লাখ মানুষ।

২০১৯ সালে ডেঙ্গু মহামারী রূপ ধারণ করলে প্রতিবাদ করেন মিজান। তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তাকে আটক করান। ঘটনাস্থলে একজন সাংবাদিক উপস্থিত হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই সময় মেয়র ছিলেন মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পরও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। তখনো আন্দোলন করেন মিজান। ওই সময় মশককর্মীরা তার বাড়িতে গিয়ে মশার ওষুধ ছিটান (ফগিং) যে তার বৃদ্ধ মা ও পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হয়ে পড়েন।

মিজানুর রহমানকে ভালোভাবেই চেনেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও নাগরিক অধিকার কর্মী মারুফ হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০ বছর ধরে পূর্ব জুরাইনের মিজান ভাইকে চিনি। তিনি নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন; কথা বলছেন। এই জায়গায় এখন কাজ করার লোকের সংখ্যা খুবই কম। আর যারা করছেন, অনেকের দ্বৈত-নীতি লক্ষ করা যায়; কিন্তু মিজান ভাইকে ব্যতিক্রম মানুষ হিসেবে দেখছি।’