যখন-তখন ‘তুলে’ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের ওপর কাটা গায়ে নুন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে সরকারি কয়েকটি সংস্থা। অগ্নিকা-ের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস হাজার হাজার অজ্ঞাত আসামি দিয়ে একটি মামলা করেছে, সেটি এখন ‘বাণিজ্য’ হিসেবে ব্যবহার করছে পুলিশ। যখন-তখন ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে পুলিশ টাকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা।

গতকাল শনিবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কাছে ‘বঙ্গবাজার অগ্নি ক্ষতি সহায়তা তহবিল’-এ ১ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই অভিযোগ তোলেন বঙ্গবাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হুদা।

তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় আমার যদি আংশিক দোষ থাকে, কিন্তু এত লজিস্টিক সাপোর্ট থাকার পরও পুরো দোষটা আমাকেই দেওয়া হচ্ছে। আমাদের অনেক ব্যবসায়ী সেখানে উঠতে পারে না। কারণ ফায়ার সার্ভিস একটা মামলা করেছে, অজ্ঞাত হাজার হাজার আসামির নাম দেওয়া হয়েছে। পুলিশ এ ইস্যুতে বাণিজ্য করছে, যখন-তখন আমার ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের মামলা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা জানতে চাই,  সেখানে কোনো রকমের সন্ত্রাসী কর্মকা- হয়েছে কি না। আমরাও চাই তদন্ত ঠিকমতো হোক। কিন্তু পুলিশ আমার ব্যবসায়ীদের যখন-তখন তুলে নিয়ে গেলে ফায়ার সার্ভিস কতটুকু উপকৃত হবে, আমরা জানি না। ফায়ার সার্ভিসের ওপর আক্রমণটা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে শুরু হয়নি। এটি করেছে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারিরা।’

গতকাল শনিবার বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য এক কোটি টাকা দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কাছে ‘বঙ্গবাজার অগ্নি ক্ষতি সহায়তা তহবিল’ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়। এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির নেতাদের কাছে চেক হস্তান্তর করেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি ও সার্ক চেম্বারের নতুন সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘যেকোনো ধরনের অগ্নিকা-ের ঘটনাই ব্যবসায়ীরদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। সেখানে আগুনের ভয়াবহতা এতটাই যে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেখানে যাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে এই সংকটে আমাদের পক্ষ থেকে সামান্য হলেও সহযোগিতা করা উচিত। সে জন্য আমরা এই এক কোটি টাকা সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের অবশ্যই কমপ্লায়েন্স মেনে ব্যবসা করা উচিত। তবে অগ্নিকা-ের পর সব দোষ ‍শুধু ব্যবসায়ীদের না দিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক ভবন ও কলকারখানার লাইসেন্স দেয়, তারাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। এ ধরনের দুর্ঘটনায় সেই সব প্রতিষ্ঠানেরও দায় রয়েছে।’ ‍ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বঙ্গবাজারে আগের মতো অবকাঠামো নির্মাণ না করে স্থায়ী ও আধুনিক ভবন নির্মাণে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি।

দেশের কলকারখানাগুলোতে ফায়ার সেফটি নিশ্চিতে সরকারের সঙ্গে এফবিসিসিআই কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাইভেট সেক্টরে ফায়ার সেফটি নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা ফায়ার সেফটি কাউন্সিল গঠন করেছি। এই সেফটি কাউন্সিলের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার কোম্পানি পরিদর্শন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিটি কলকারখানার অগ্নিনির্বাপণ নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই সেফটি কাউন্সিল সারা দেশে মোট ৪৪ হাজার কোম্পানি পরিদর্শন করবে।

এ সময় দোকান ও শপিং মলে ফায়ার সেফটি নিশ্চিতে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও এফবিসিসিআই ফায়ার সেফটি কাউন্সিলকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি।

এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, বঙ্গবাজারের ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস একাধিকবার সতর্ক করলেও মার্কেট কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টির গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ সময় শুধু সরকারকে দোষারোপ না করে ব্যবসায়ীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানান, রাজধানীতে বিদ্যমান মার্কেটগুলো পরিদর্শন করা হচ্ছে। কোনো ধরনের ঝুঁকি লক্ষ করা গেলে তাদের সতর্ক করার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হবে।

কলকারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে এফবিসিসিআই সেফটি কাউন্সিলের চলমান বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন কাউন্সিলের প্রধান ব্রিগেডিয়ার আবু নাঈম মো. শহীদুল্লাহ।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মো. আমিন হেলালী, মো. হাবীব উল্লাহ ডন, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালকবৃন্দ, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।