যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্সের উৎস নিয়ে প্রশ্ন সিপিডির

সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি প্রবাস-আয়। সাম্প্রতিককালে আসা প্রবাস-আয় বিদেশে পাচার হওয়া টাকাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আনা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

গতকাল শনিবার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২২-২৩ : তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে এ পরামর্শ দিয়েছেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

তিনি বলেন, ‘জানি, আমাদের বেশির ভাগ রেমিট্যান্স কোথা থেকে আসে। গত ১০ মাসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৯ দশমিক ২২ লাখ মানুষ গেছে। সেখান থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী রেমিট্যান্স আসছে না। লোক যাওয়া ও রেমিট্যান্সের মধ্যে মিসম্যাচ হচ্ছে। আগে সৌদি থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসত, এখন সেই জায়গা দখল করেছে যুক্তরাষ্ট্র।’

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যারা যায় তাদের বেশির ভাগ হোয়াইট কালার জব করে। অনেকে ঘর-বাড়ি জমিজমা বিক্রি করে দেশ থেকে টাকা নিয়ে চলে যায়। অনেক শিক্ষার্থীও আছে, তারা তো আর টাকা পাঠাতে পারে না। তাহলে এই টাকা কোথা থেকে আসছে?’

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এর একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, যেখান থেকে টাকা পাচার হয়েছে, সেখানেই আবার ফেরত আসছে। রেমিট্যান্সের ওপর যে আড়াই শতাংশ ইনসেনটিভ বা সাবসিডি দেওয়া হচ্ছে সেটার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখা উচিত।’

সংস্থাটি বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩০৫ কোটি ডলার এসেছে। গতবার একই সময়ে ২৮৭ কোটি ডলার এসেছিল। অন্যদিকে গত জুলাই-এপ্রিলে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮২ কোটি ডলার কম।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদেশে লোক যাওয়া ও রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যে একটা অসামঞ্জস্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসছে, যা অস্বাভাবিক। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, পাচার করা অর্থ ফেরত আসছে। রেমিট্যান্স আনলে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যায়, সেই সুযোগ কেউ কেউ নিতে পারেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনলে তার ওপর কর আরোপ করার বিধান রয়েছে। রেমিট্যান্স হিসেবে এনে প্রণোদনার সুবিধা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

সিপিডি বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার লোক সৌদি আরবে গেছেন। এ সংখ্যা ওই সময় প্রবাসে যাওয়া সাড়ে ২১ লাখ লোকের প্রায় ৫৭ শতাংশ। কিন্তু ওই সময়ে সৌদি আরব থেকে আসা রেমিট্যান্স কমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স আসা বেড়েছে। সৌদি আরবের জায়গা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

জ্বালানি তেলের দামের বিষয়ে সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ৭ বছরে বিপিসি মোট ৪৩ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা লাভ করেছে। কর দেওয়ার পর তাদের নিট মুনাফা ৩৬ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। এই সময়ে ৭ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা কর দিয়েছে বিপিসি।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরকার দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে বেশি ভর্তুকি দিয়েছে। এখানে এখন কিছু করা যেতে পারে। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, তখন দেশের বাজারেও দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে, তখন স্থানীয় বাজারে দাম কমানো হয় না।’

বাংলাদেশে গত আগস্ট মাসে হঠাৎ অকটেন, পেট্রলসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৩৩ থেকে ৫২ শতাংশ বাড়ানো হয়। বৃদ্ধির ওই হার ছিল গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর গ্যাস-বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়। এ ছাড়া ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য বেশি দামে আমদানি করতে হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়ে। বাড়তে থাকে পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতির হার। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি একলাফে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়েছিল।

অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘২০২৩-২৪-এর যে বাজেটটা হচ্ছে, এটি অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে হচ্ছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হচ্ছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ, এটা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। আমাদের মূল্যস্ফীতির কথা ধরলে এটি গত ১০ বছরে সবচেয়ে বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারÑ গত ৭ বছরে সবচেয়ে কম। এ রকম পরিস্থিতি নিয়েই আমরা এ অর্থবছর শেষ করে আগামী অর্থবছরের বাজেটের দিকে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘২০২২-২৩-এর বাজেট যদি চিন্তা করি, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত আমাদের অর্থনীতিতে কী হতে পারে তা বলেছিলাম। তারপরও দেখলাম, ২০২২-২৩-এর বাজেটে জিডিপি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে ছিল। রিজার্ভের ওপর যে চাপ পড়বে সেটিও আমরা বলেছিলাম। অর্থনীতিবিদদের সে সময়ের পরামর্শগুলো আমলে নিলে অর্থনীতিতে আরেকটু সমন্বয় করা যেত।’

তিনি বলেন, ‘এবারের বাজেটে অর্থনীতির ন্যায্যতা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মূল দর্শন হিসেবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।’ 

মুদ্রা বিনিময় হার সম্পর্কে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ করা উচিত। অনেক আগেই করা দরকার ছিল। আমরা টাকাকে শক্তিশালী রাখতে চেয়েছি।’

গত বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা। ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে স্থানীয় বাজারে ডলারের সরবরাহে টান পড়ে, ফলে দাম বাড়তে থাকে। এখন ১০৮ টাকায় ডলার বিক্রি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে বেশি দামেও ডলার বিক্রি হচ্ছে।