পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের মতো ভোগ্যপণ্যের মূল্যও চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। শেয়ারের কৃত্রিম সংকট ও গুজব ছড়িয়ে কারসাজির মাধ্যমে যেভাবে দাম বাড়ানো হয়, একইভাবে ভোগ্যপণ্য কিংবা নিত্যপণ্যের দামও অস্বাভাবিক হারে বাড়াতে দেখা যায়। পুঁজিবাজারের মতো এখানেও রয়েছে বিভিন্ন সিন্ডিকেট, যারা সরবরাহজনিত কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে দেশ ভুগছে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে। আর সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের বর্ধিত মূল্য মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। পুঁজিবাজার ও পণ্যবাজারে কারসাজির একই হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২০ সালে করোনার সময়ে পুঁজিবাজারের মন্দার সময়ে বীমাসহ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে কারসাজির মাধ্যমে চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে আনা হয়। আর এ চাঙ্গাভাবের মধ্যে বাজারের চিহ্নিত কারসাজিকারকরা বিভিন্ন শেয়ারের কৃত্রিম সংকট ও গুজব ছড়িয়ে, অস্বাভাবিক দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। আর অস্বাভাবিক দরে শেয়ার কিনে ধরা খেয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, আটকে গেছে বিনিয়োগ। তবে শেয়ারে এ কারসাজির তদন্ত এবং কখনো কখনো দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও নিত্যপণ্যের মূল্য কারসাজির হোতারা অধরাই থাকেন।
অবশ্য ভোগ্যপণ্য কিংবা নিত্যপণ্যের কারসাজিকারকরা পুঁজিবাজারের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। এ কারণে এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থাও নিতে দেখা যায় না সরকারের পক্ষ থেকে। এতে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে আদার দাম তিনগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশে পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও এক মাসের ব্যবধানে প্রায় তিনগুণ দরে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। আমদানি করা হয় না, এমন নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যও সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়েছে। একই অবস্থা কাঁচা মরিচ, সবজি থেকে শুরু করে ব্রয়লার মুরগি, ডিমেও। পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এক যুগে বাংলাদেশের ভোক্তামূল্য সূচক (সিপিআই ইনডেক্স) দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে বর্তমানে ১১১ দশমিক ৪৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে পুঁজিবাজারে একটি ট্রেন্ড চালু হয়েছে। সেটি হচ্ছে, আইপিওতে (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আসা কোনো কোম্পানির শেয়ার সেকেন্ডারি বাজারে লেনদেন শুরুর পর থেকেই দাম বাড়তে শুরু করে। আইপিওর শেয়ার সেকেন্ডারি বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় কারসাজিকারকরা তা বেশি করে কিনে সেই শেয়ারের স্বাভাবিক সরবরাহ অনেকটাই বন্ধ করে দেয়। ফলে দাম বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে উচ্চমূল্যে সেসব শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে গছিয়ে দিয়ে বড় অঙ্কের মুনাফা লুটে নেয় কারসাজিকারকরা। পণ্যবাজারের ক্ষেত্রে ভোক্তাকে ঠিক একই প্রক্রিয়ায় ঠকাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরা। সম্প্রতি চাষিদের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে মজুদ করে ভোক্তার কাছে দ্বিগুণেরও বেশি দরে বিক্রি করছে তারা।
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের পণ্যমূল্য বৃদ্ধির নানান প্রেক্ষাপট রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। বিশ^বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হলে তা দেশের বাজারে প্রভাব পড়বে এটি সাধারণ বিষয়। কোনো ব্যবসায়ী লস দিয়ে পণ্য বিক্রি করবে না। তবে আমরা লক্ষ করছি বাজারে ভোক্তাকে ন্যায্যমূল্য পেতে হলে বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রয়োজন, তা নেই। গুটি কয়েকজনের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় বাজারব্যবস্থা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। সব ব্যবসায়ী অতিমুনাফা করতে চায়। এর জন্য নানান পদক্ষেপ নিতে পারে। এর মধ্যে টিসিবির মাধ্যমে একটি পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে কার্ডধারী ব্যক্তিরাই শুধু স্বল্পমূল্যে কিছু খাদ্যপণ্য পাচ্ছেন। যা দেশের জনসংখ্যার হিসাবে পর্যাপ্ত নয়। এমন পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী।
গোলাম রহমান আরও বলেন, সরকার চাইলে নিজেরাই গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি করে বিক্রি করতে পারে। এতে রাষ্ট্র লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশের জনগণও স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য পাবেন। এ ছাড়া বাজারে যাতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সেজন্যও সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ও একচেটিয়া গুটিকয়েক লোকের হাত থেকে বাজার ব্যবস্থাকে বের করে আনা দরকার। পাশাপাশি কেউ যদি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা করতে চান, তাদের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান সংকট নিরসন হওয়া সম্ভব বলে মনে করছি।
হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের মুরগি ও ডিমের বাজার। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ৫২ দিনে মুরগি ও বাচ্চা বিক্রি করে ৯৩৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছে প্রান্তিক খামারিদের একটি সংগঠন। ৮ থেকে ১০টি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশের পোলট্রি শিল্প। এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্রয়লার মুরগি, একদিনের বাচ্চা, মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি ও নিজেরা জোটবদ্ধ হয়ে গত এক বছরে এগুলোর দাম ৪০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে এই সিন্ডিকেট।
আমদানিনির্ভর ভোজ্য তেল ও চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে প্রভাবশালী আটটি গ্রুপ। এ দুই পণ্যের ৮০-৯০ শতাংশের বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে গত এক বছরে চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। যদিও এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের কম। অবশ্য এ সময়ে ভোজ্য তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে না বাড়লেও প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এ পণ্যের দাম এক বছরে প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে। এ দুটি পণ্যের দাম বাড়াতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, জ¦ালানির কারণে উৎপাদন ব্যাহতসহ নানা কারণ দেখিয়েছেন নিয়ন্ত্রণকারী কোম্পানিগুলো। তবে ডিলাররা জানিয়েছেন, ডিও থাকার পরও বিলম্বে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজারে যেসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা থাকে সেগুলোর বিষয় আমরা সবসময় তদারকি করে থাকি। তবে সবজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবু আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জনবল সংকট রয়েছে। আরও কিছু সমস্যা বিদ্যমান। সবকিছু ছাপিয়ে নিত্যপণ্যের অধিক মুনাফা রোধে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এর জন্য সবার আগে ভোক্তাদের কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে অধিক মুনাফা কিংবা কারচুপি পাবে, সঙ্গে সঙ্গে বাজার তদারকি সংস্থাগুলোকে অবহিত করতে হবে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে অস্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান হবে।
সফিকুজ্জামান জানিয়েছেন, কিছু করপোরেট কোম্পানির বিরুদ্ধে পণ্যের অবৈধ মজুদ এবং পণ্যের দাম বাড়াতে উৎপাদন বন্ধ করার মতো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশন ইতিমধ্যেই ৫৪টি মামলা করেছে।