ব্রয়লার মুরগির দাম গত বছর ছিল প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, যা বর্তমানে অন্তত ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই-আড়াই মাস আগে তা সর্বোচ্চ ২৭০ টাকায় উন্নীত হয়েছিল। দেশে মুরগির বাচ্চা ও পোলট্রি খাবারের সিংহভাগ উৎপাদন করে সাত-আটটি কোম্পানি। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী কোম্পানি হচ্ছে কাজী ফার্মস গ্রুপ, নারিশ, প্যারাগন, আফতাব, কোয়ালিটি, প্রোভিটা, সিপি ও ডায়মন্ড এগ। এসব কোম্পানি নিজেরা মাংস ও ডিম উৎপাদনের পাশাপাশি মুরগি বাচ্চা ও খাবারও উৎপাদন করছে। নিজেরা উৎপাদনের পাশাপাশি প্রান্তিক খামারগুলোর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করছে। ফলে দেশের পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে করপোরেট এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে।
পোলট্রি খাতে মাংস ও ডিমের জন্য মুরগির একদিন বয়সী বাচ্চা ক্রয় করে থাকেন খামারিরা। এসব বাচ্চা যেসব মোরগ-মুরগির মাধ্যমে উৎপাদন হয়; সেগুলোকে বলা হয় প্যারেন্ট স্টক (পিএস)। আর পিএস উৎপাদন হয় গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক (জিপি) থেকে। দেশে জিপি ও পিএসের বাজারের পুরোটাই এসব করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে।
ব্রয়লারের জিপি স্টকের বাজারে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ৮৫ শতাংশ। ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস দেশের পোলট্রি খাতে করপোরেটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক গবেষণা চালায়। গবেষণার ভিত্তিতে ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘পোলট্রি সেক্টর স্টাডি বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে আসে, দেশে মাংসের জন্য পালনকৃত ব্রয়লার মুরগির জিপি স্টক সবচেয়ে বেশি রয়েছে কাজী ফার্মস গ্রুপের। দুটি খামারে তাদের ৪৯ হাজার জিপি ব্রয়লার রয়েছে। ব্রয়লারের জিপির বাজারের ৩৪ শতাংশই কাজী ফার্মসের দখলে। প্রতিষ্ঠানটির ব্রয়লার ও লেয়ারের পিএস খামার রয়েছে সাতটি। তাদের মোট হ্যাচারির সংখ্যা ১৩টি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ফিড কারখানা রয়েছে দুটি।
কাজী ফার্মসের মতোই প্যারাগন, আফতাব, নারিশ ও সিপিও একই সঙ্গে খাদ্য, বাচ্চা, ডিম ও মাংস উৎপাদন করে থাকে। প্যারাগন গ্রুপের দুটি খামারে ব্রয়লারের জিপি রয়েছে ১৪ হাজার। জিপি ও লেয়ার ফার্মের সংখ্যা তিনটি। হ্যাচারি রয়েছে সাতটি। আর খাদ্য উৎপাদন কারখানা রয়েছে পাঁচটি। সিপির জিপি ব্রয়লার রয়েছে ২৪ হাজার। নারিশ ফার্মের ২২ হাজার ৫০০ জিপি ব্রয়লার, খাদ্য উৎপাদন কারখানা পাঁচটি ও হ্যাচারি রয়েছে তিনটি। আফতাব হ্যাচারির জিপি ব্রয়লার রয়েছে ১২ হাজারটি, খাদ্য উৎপাদন কারখানা তিনটি।
তবে মুনাফা, ডিম ও মাংসের বাজার হিস্যাসহ ব্যবসায়িক বিভিন্ন তথ্য প্রকাশে গোপনীয়তা বজায় রাখে এসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে বার্ষিক মুরগির মাংসের চাহিদা ৪০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় ৩১ কোটির কিছু বেশি মুরগি। অবশ্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে মুরগি উৎপাদন হয় ৩৭ কোটি ৫৬ লাখ। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, দেশের মুরগির মাংসের বাজারে তাদের হিস্যা ১৫ শতাংশের বেশি নয়।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্যারাগন, কাজী, নারিশ ও সিপি বাংলাদেশের মতো কয়েকটি কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে পোলট্রির বাজার। এসব কোম্পানি বাচ্চা, মুরগির মাংস, ডিম, খাবার ও ওষুধের মাধ্যমে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারাই নির্ধারণ করছে মুরগির মাংস ও ডিমের দাম কত হবে। এসব কোম্পানির সিন্ডিকেট আবার পোলট্রির বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এ সিন্ডিকেটের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা করপোরেট এসব কোম্পানিকে একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।