কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধে পুরনো কায়দা

আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রাজস্ব জাল বিছিয়ে সাধারণ আয়ের মানুষকে আটকে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। জীবনযাত্রার খরচ চালাতে হিমশিম খাওয়া মানুষদের ওপর কর পরিশোধে চাপ বাড়ানো হয়েছে। আইনমতো কর পরিশোধ না করলে রাজস্ব আইন সংশোধন করে ১ জুলাই থেকে শাস্তি বাড়ানো হয়েছে। অথচ সম্পদশালীদের করফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে সেই পুরনো ঢিলেঢালা পথেই হেঁটেছে।

বিদ্যমান আয়কর আইনে, করদাতাদের আয় তিন লাখ পর্যন্ত করমুক্ত। তবে এ সীমার বাইরে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কর দিতে হবে ৫ শতাংশ হারে, পরের ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, পরের ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ ও পরের ৫ লাখ পর্যন্ত ২০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর কর দিতে হবে ২৫ শতাংশ। তবে এতদিন করযোগ্য আয় ৩ লাখ টাকার বেশি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বসবাসকারী করদাতার জন্য ন্যূনতম আয়কর ৫ হাজার টাকা। অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাসকারীর জন্য ৪ হাজার এবং সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্যান্য এলাকায় বসবাসকারীর জন্য ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

এতদিন ইটিআইএন নিয়েও অনেকে করযোগ্য আয় না থাকলে শুধু রিটার্ন দাখিল করেছে। একটি টাকার কর দিতে হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থ বিল বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ১ জুলাই থেকে করযোগ্য আয় না থাকলেও ২ হাজার টাকা ন্যূনতম কর দিতে হবে। একই সঙ্গে ১৮ বছর হলেই ইটিআইএন গ্রহণে কঠোরতা আনা হয়েছে।

সাধারণ আয়ের অনেক করদাতা বলেছেন, খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুই এখন বেশি। এর মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর কর পরিশোধে চাপ দেওয়া হলে ভোগান্তি বাড়বে।

রায়হান মল্লিক দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে থাকেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসে বেতন পান ৩৫ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়ার খরচ, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ সংসারের সব খরচ শেষে একটি টাকাও থাকে না। বরং পাড়ার মোড়ে দোকানে প্রতি মাসেই বাকি করতে হয়। এক করবর্ষে তার আয় ৩ লাখ টাকার বেশি হওয়ায় তাকে ঠিকই হিসাব কষে কর দিতে হয়। আসছেবারের বাজেটে নতুন আইন করায় তার স্ত্রীর করযোগ্য আয় না থাকলেও ১ জুলাই থেকে বাড়তি আরও ২ হাজার টাকা ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হবে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় মাপের করদাতাদের একজনের কাছ থেকে সরকার যে আয় আসে, সাধারণ আয়ের ৫০ জনের কাছ থেকেও আসে না। তাই সম্পদশালীদের দিকে সরকারের বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। আগামী অর্থবছর থেকে রিটার্ন জমা দিতে দেরি হলে বেশি হারে জরিমানা দিতে হবে। প্রতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত আয়কর পরিশোধ করে রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। যদি এনবিআর বিশেষ ক্ষমতাবলে নিয়মিত কর ও রিটার্ন জমার সময় না বাড়ায় তবে করদাতা এনবিআরের অনুমতি নিয়ে ১ ডিসেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত কর ও রিটার্ন জমা দিতে পারবে। নিয়মিত সময়ের পর কর পরিশোধ ও রিটার্ন জমা দেওয়া হলে এতদিন প্রদেয় করের ২ শতাংশ জরিমানা পরিশোধ করতে হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে আইন করে জরিমানার পরিমাণ প্রদেয় করের পরিমাণ দ্বিগুণ ৪ শতাংশ নির্ধারণে প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়, ইটিআইএন ও রিটার্ন জমায়ও কঠোরতা আনা হয়েছে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরের অর্থবিলে আইন করে ৪০ ধরনের কাজে ইটিআইএন নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব কাজে অনেক ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা ছিল বা ছাড় দেওয়া হয়েছে। ১ জুলাই থেকে আর এ সুযোগ থাকবে না। সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর সঞ্চয় স্কিম, বাড়ির নকশা অনুমোদন, সমবায় সমিতির নিবন্ধন, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রকৃত আয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি হলে, ব্যাংক হিসাব খুলতে ও ব্যাংক ঋণ পেতে, পাসপোর্ট করতে, বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি কেনা, গাড়ি কেনা এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন করতে, যেকোনো ব্যবসায়ে লাইসেন্স পাওয়া বা নবায়ন করতে ইটিআইএন নেওয়ার কঠোরতা থাকছে। বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউলিটি সংযোগ নিতে, জাতীয় সংসদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনসহ রাষ্ট্র পরিচালিত যেকোনো নির্বাচনে অংশ নিতে, হোটেল-রেস্তোরাঁ নির্মাণ করতে, নতুন শিল্প স্থাপন, ঠিকাদারি ব্যবসা করতে, এককালীন ৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সোনা, মুক্তা বা মূল্যবান গয়নাসহ যেকোনো কেনাকাটায়ও ইটিআইএন দেখাতে হবে। উচ্চ বেতনের চাকরিতে যোগদানে এবং ইংরেজি মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী পড়াতে ব্যয় বহনকারীকে ইটিআইএন জমা দিতে হবে।

সরকারের এ আইন মেনে অনেকে ইটিআইএন নিলেও রিটার্ন দাখিল করে না। এতে করদাতা হিসেবে এনবিআরের খাতায় নাম থাকলেও করযোগ্য আয় না থাকায় এনবিআরের আদায়ে প্রভাব পড়ছে না। বর্তমান ৮৭ লাখ করদাতা ইটিআইএন গ্রহণ করলেও রিটার্ন দিচ্ছে গড়ে ৩১ লাখ। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থ বিলে ৩৮ ধরনের সেবা পেতে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ লাখ টাকা বেশি ঋণ নিলে, কোম্পানি পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার হলে, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি-ইআরসি) নিতে হলে, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হলে, সমবায় সমিতি নিবন্ধন নিতে, বীমা কোম্পানির সার্ভেয়ার হতে হলে, ১০ লাখ টাকা বেশি মূল্যের জমি-ফ্ল্যাটের দলিল করতে, ক্রেডিট কার্ড নিতে, পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ নিতে, ড্রাগ লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিএসটিআই লাইসেন্স ও ছাড়পত্র পেতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করতে, কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিতে, অস্ত্রের লাইসেন্স নিতে, ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে, ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে, নির্বাচনে অংশ নিতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১৬ হাজার টাকা হলে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ১৬ হাজার টাকার বেশি বেতন গ্রহণ করতে, পণ্য আমদানি-রপ্তানির বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে রিটার্ন জমার সিøপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

আগামী অর্থবছরের উপজেলা পর্যায়ে আরও ১৫টি আয়কর ও ১৫টি ভ্যাট কমিশনারেট স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। এতে উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ আয়ের কর-ভ্যাটযোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা সহজ হবে।

সরকার সাধারণ আয়ের মানুষের ধরতে এতসব আয়োজন করলেও আগামী অর্থবছরে আয়কর এবং ভ্যাটের অর্থ হিসাব কষে ঘরের তোলার কোনো কৌশল করেনি। সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে ভ্যাট পরিশোধ করে থাকে। ব্যবসায়ীরা তা ঠিকই কড়ায়-গন্ডায় হিসাব কষে আদায় করে থাকে।

২০২১-২২ অর্থবছরের এনবিআরের সর্বশেষ হিসেবে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ৭১ হাজার। এর মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করে ১ লাখ ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠান। অথচ মোট আদায়কৃত ভ্যাটের অর্ধেকের বেশি পরিশোধ করে গড়ে ১১০ প্রতিষ্ঠান। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে সারা দেশে ভ্যাট প্রদানে সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে ৩০ লাখ। অন্যদিকে এনবিআরের সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে রিটার্নে সম্পদ ও আয়ের তথ্য গোপন করে ৩৩ হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। সম্পদশালী করদাতারা এ ফাঁকির সঙ্গে জড়িত। আগামী অর্থবছরের বাজেটেও ধনী ব্যক্তিদের করফাঁকি বন্ধে নতুন কোনো কৌশল যোগ করা হয়নি। অর্থ পাচার বন্ধেও নেই নতুন উল্লেখযোগ্য কোনো কৌশল। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো বিভিন্ন দূতাবাসে রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে বিদেশে পাচারকারীদের সম্পদ চিহ্নিত করা এবং সেই দেশে আইন (ল ফার্ম) সংস্থা নিয়োগে পদক্ষেপ নিতে খোদ এনবিআরের সুপারিশ থাকলেও তা আসছে বাজেটে আনা হয়নি।