আবাহনী মোহামেডান মানেই উৎসব

আমাদের সময় ফুটবল উন্মাদনায় ভরপুর ছিল। এখনকার প্রজন্ম যেটা অনুধাবন করতে পারবে না। আবাহনী-মোহামেডান খেলা হলে তো সারা দেশে উৎসব শুরু হতো, ঈদের আনন্দে রূপ নিত চারপাশ। সেই সময় ফুটবল মানুষের হৃদয়ে ছিল, ভালোবাসায় ছিল, নির্মল আনন্দের অনুষঙ্গ ছিল। আমরা যখন খেলেছি, যখন আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ কবে এটা দশ থেকে পনেরো দিন আগে থেকেই জানা যেত। তারিখ জানার পর থেকেই মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেত। গ্রাম-গঞ্জের চায়ের টেবিলেও ঝড় বয়ে যেত। দুই দলের প্র্যাকটিস দেখার জন্যও দশ-পনের হাজার দর্শক ছুটে আসত মাঠে। ম্যাচের আগে ৭-৮ দিন এই দৃশ্য দেখা যেত। কোন খেলোয়াড় কেমন অবস্থায় আছে, কে ফিট আর কে আনফিট, এগুলো নিয়ে চলত বিচার-বিশ্লেষণ। তুমুল কথার লড়াই হতো। আমরা যারা খেলোয়াড় ছিলাম, তারাও শঙ্কিত থাকতাম। যদি হেরে যাই, সাপোর্টাররা আমাদের ছাড়বে না। খেলোয়াড়দের বহর বা ক্লাবে ঢিল ছোড়া তো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। পারলে খেলোয়াড়দের ওপরও চড়াও হতো। আবার যখন জিততাম, তখন এই দর্শকরাই কাঁধে তুলে নাচত। এমনই ছিল আমাদের সময়ে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ।

আমার ক্লাব ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে আবাহনীতে। মোহামেডানের বিপক্ষে অনেক স্মরণীয় ম্যাচই মনে পড়ে। তবে হৃদয়ে বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে ১৯৮৪ সালের লিগের একটা ম্যাচ। সেবার ফরম্যাটটা এমন ছিল- ২০ দলের মধ্যে সেরা ছয় দল নিয়ে সুপার লিগ হবে। সেই সময় প্রথম পর্বের শেষ ম্যাচে আবাহনী-মোহামেডান খেলা। মোহামেডানের চেয়ে ৬ পয়েন্ট এগিয়ে আছি। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত আমরা সেদিন ২-১ গোলে পিছিয়ে ছিলাম। মোহামেডান জিতলে ব্যবধান তিন পয়েন্টে নেমে আসত। ঠিক সেই সময় গোল করে দলকে সমতায় ফিরিয়ে যে উচ্ছ্বাস করেছিলাম, যে আনন্দ পেয়েছিলাম, সেটা মনে রাখার মতো। আমরা পরবর্তী পর্যায়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হই। যদিও সেবার এক পর্যায়ে আমাদের ৬ পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। এরপরও আমরা ৬ পয়েন্ট এগিয়ে যাই একটা সময়।

সেই ফুটবলটা এখন কোথা থেকে কোথায় নেমে এসেছে, এটা আমরা যারা আছি বা আমাদের খেলা যারা দেখেছে তারাই শুধু বলতে পারবে। অনেক কারণেই আমাদের ফুটবল তার জৌলুশ হারিয়েছে। সে অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ। তবে এটা সত্য, সেই উন্মাদনা ফিরিয়ে আনতে হলে আবাহনী-মোহামেডান লড়াই হতে হবে। ভালো মানের খেলোয়াড় আসতে হবে। পাশাপাশি মাঠে ভালো ফুটবল হতে হবে। ইন্ডিভিজুয়াল স্কিলড খেলোয়াড়ও দরকার। এই সব কিছুর অভাব দেখতে পাচ্ছি বলে ফুটবলটা আজ এত নিচে নেমে এসেছে।

মাঝে অনেক দিন আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথটা সেভাবে হয়নি। কারণ মোহামেডান শক্তির দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে ছিল। আবাহনী একচেটিয়া খেলে যাচ্ছিল, মোহামেডানের অনুপস্থিতির জন্য সেই উন্মাদনা ঝিমিয়ে পড়েছে। এবারের ফেডারেশন কাপ ফাইনালে ওঠার মতো নিশ্চয়ই মোহামেডান লিগ ও টুর্নামেন্টগুলোতে পুরনো দিনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছুড়ে দেবে।