বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে আগের সেই উত্তেজনা এখন নেই। ভাটা পড়েছে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথেও। তবে এই দুই দলের মুখোমুখি লড়াই দেশের ফুটবলের পুরোনো দর্শকদের ঠিকই স্মৃতি কাতর করে। আজকের ফেডারেশন কাপ ফাইনাল ঘিরেও তেমনটাই হচ্ছে। কারণ এই ম্যাচটা যে ‘স্পেশাল’।
কত সব স্মরণীয় ঘটনা উপহার দিয়েছে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ। যার অনেক কিছু এই প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মতোই মনে হবে। ১৯৮৭ সালের লিগে যা ঘটেছে সেই চিত্রটা তুলে ধরা যেতে পারে এ ক্ষেত্রে। দর্শকদের কথা চিন্তা করে সেবার লিগের প্লে-অফ ম্যাচে দুই দলের অধিনায়ক খেলার ফলাফল নির্ধারন করেছিলেন!
ক্রীড়া বিশ্লেষক ও দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন যেমন বললেন, ‘একভাবে চিন্তা করছে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ একটা ক্ষেত্রে যেকোনো ডার্বির চেয়ে এগিয়ে থাকবে। এটাই সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র ডার্বি, যেখানে সমর্থকদের কথা ভেবে দুই দলের অধিনায়ক নিজেরা নিজেরা খেলার ফল নির্ধারন করেছিলেন।’
অতীতে ফিরে মোস্তফা মামুন সেই ম্যাচের প্রেক্ষাপট তুলে ধরলেন, ‘লিগের শেষ ভাগে চিত্রটা এমন ছিল- আবাহনী ড্র করলে চ্যাম্পিয়ন, মোহামেডান জিতলে দুই দলের পয়েন্ট সমান হবে। শেষ পর্যন্ত মোহামেডান সেই ম্যাচ জিতে এবং প্লে-অফ আয়োজিত হয়। সেই প্লে-অফটা ১২০ মিনিট পর্যন্ত ছিল গোলশূন্য। এরপর টাইব্রেকারে যেটা হলো, দুই দলের অধিনায়ক আসলাম ও রনজিৎ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রফি ভাগাভাগির।’
‘দুই অধিনায়কের মত হলো, টাইব্রেকারের মাধ্যমে যদি ফল নির্ধারন হয় এবং কোনো একটা দল ম্যাচ জেতে, তাহলে অন্য দলের সমর্থকরা সেটা মেনে নেবে না। রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির তৈরি হবে। এটা মনে করার কারণ, এর আগে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে মারামারি হতো এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতো। এই পরিস্থিতে দুই দলের অধিনায়ক নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে ল্যাপ অব অনার দিয়েছিল।’
তবে এই বিষয়টা সেই সময়কার ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ভালোভাবে নেননি। মোস্তফা মামুন বলেন, ‘দুই অধিনায়ককে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তখন। বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি পেয়েছিল খেলোয়াড়রা। পরে ক্লোজ ডোর ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল। বহিষ্কৃত খেলোয়াড়রা সেই ম্যাচে খেলেনি। বিদেশি খেলোয়াড়রাও চলে গিয়েছিল। উত্তেজনাহীন একটা ম্যাচ জিতে মোহামেডান ১৯৮৭ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়। পরের বছরও চ্যাম্পিয়ন হয়ে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়নের রেকর্ড গড়ে দলটি। ৮৩, ৮৪ ও ৮৫ সালে শিরোপা জিতে আবাহনী প্রথম হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ৮৬, ৮৭ ও ৮৮ সালে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে মোহামেডান তার জবাব দিয়েছিল। লড়াইটা ছিল এরকম। সমর্থকরাও সেই সময় কোনো কিছু নিয়ে ছেড়ে কথা বলতো না।’
দেশের ফুটবলের এই ইতিহাসগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে ঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে মনে করেন মোস্তফা মামুন, ‘আমি মনে করি ইতিহাসে এই জিনিসটা আমরা প্রোপারলি রিকগনাইজ করিনি। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের উত্তেজনা পরের প্রজন্মের কাছে ট্রান্সফার করতে পারিনি বলেই আজকে ম্যাচটার এই করুণ অবস্থা।’
বাংলাদেশের ফুটবল আবারও জাগিয়ে তুলতে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের হারানো সেই উত্তেজনা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই বলে মনে করেন মোস্তফা মামুন।