২০২৩-২৪ অর্থবছর একটি চ্যালেঞ্জিং বছর। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বৈশি^ক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ চাপে অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা। এ কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো প্রায় অসম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চাকাক্সক্ষী বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব নয়।
গতকাল শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এ কথা বলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, ‘এ কঠিন সময়ে কঠিন কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল, যা নেওয়া হয়নি। প্রবাস-আয় নিম্নমুখী। বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাকাক্সক্ষী। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও নিম্নমুখী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’
বাজেট-ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে যে ঋণের কথা বলা হয়েছে, তা মূল্যস্ফীতি বাড়াবে বলে মনে করছে সিপিডি, যদিও অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে নামানোর কথা বলেছেন।
কারও আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও সরকারি ৩৮টি সেবা নিতে টিআইএনের বিপরীতে তার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা কর নেওয়ার বিধান বৈষম্যমূলক মনে করছে সিপিডি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, “অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরের বাজেট ‘সময়োপযোগী নয়’; অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আরও অনেক উদ্যোগ নিতে পারতেন মন্ত্রী।” তিনি বলেন, ‘জিডিপি ও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, তাতে যেসব অনুমিতি বা অর্থনীতির সূচক ধরা হয়েছে, গত বছরের সঙ্গে তুলনা করে মনে হয়েছে, এসব সূচক বাস্তবসম্মত নয়।’
সংস্থার সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ আয় না বাড়লে সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাড়বে। কাঠামোগত, অনুমিতিগত দুর্বলতার কারণে বাজেট বাস্তবায়নে আবারও আমরা নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হব। আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটা ব্যাংকিং কমিশনের কথা বলছি। ২০০৯ সালে ঋণখেলাপি ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা। এখন ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। এটা কেন হচ্ছে, কারা করছেন? এ নিয়ে কারও চিন্তা নেই।’
এ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ‘ব্যাংক কমিশন গঠন করা জরুরি। খুব বেশি ঋণখেলাপ হচ্ছে। খেলাপ কারা করছে, কেন করছে জানার জন্যই ব্যাংক কমিশন দরকার। ঋণখেলাপের কারণে করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ছে, ব্যাংকিং খাতে অনেক সমস্যা হচ্ছে।’
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অনুমিতিগুলো দুর্বল, আগেও আমরা দেখেছি সংকটের মূল কারণগুলো অনুধাবন না করে বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। এজন্য শেষ পর্যন্ত অনুমিতিগুলো সত্য হয় না। বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে আকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট করলে এমন অবস্থাই হয়।’
তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ভালোই চলছিল। হঠাৎ বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হওয়ায় সেসবকে বিবেচনায় না নিয়েই গত বছর বাজেট করা হয়েছে। ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা তৈরি হলো। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের সময় অভিঘাতগুলো স্পষ্ট থাকলেও সাড়ে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছিল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়নে স্থির থাকবে ভাবা হয়েছিল, ডলার এক্সচেঞ্জ রেট ৮৬ টাকা থেকে পরিবর্তিত হবে না ধারণা করা হয়েছিল।’
সিপিডির এ বিশেষ ফেলো বলেন, ‘বছরের পর বছর অনুমিতিগুলো সত্য হয় না এবং বাস্তবতার সঙ্গে মিল থাকে না। সাড়ে ৭ শতাংশের জায়গায় ৬.০৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন থেকে ২৯ বিলিয়নে নেমেছে। বিনিময়হার ৮৬ থেকে ১০৮ টাকা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। বাস্তবতাকে বিবেচনা না করলে এমন অবস্থাই হয়।’
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন অর্থবছরের বাজেটের মূল উদ্দেশ্যে থাকা উচিত ছিল চলমান অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতার সংকট রয়েছে তা বিবেচনায় নেওয়া। প্রস্তাবিত বাজেটে বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে অনেক চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে।’
তিনি বলেন, ‘উচ্চাকাক্সক্ষার এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় চলতি বছরের থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়াতে হবে। লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে বা এডিপি কাটছাঁট করতে হবে। তা না হলে বিদেশি ঋণ নিতে হবে।’
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘নতুন অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরেও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছিল। পরে এটাকে নামিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়। সরকারি বিনিয়োগের হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ আর ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালে যা ধরা হয়েছিল তার চেয়ে কম হয়েছে এখন পর্যন্ত; সেটা ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। এখান থেকে লাফ দিয়ে ২৭ শতাংশ কীভাবে হবে? মনে হচ্ছে এটা উচ্চাকাক্সক্ষা।’
ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহ ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ বছরের ঋণ প্রবাহ যেটা ধরা হয়েছে, সেটা গত বছরের ধরা ঋণ প্রবাহের সঙ্গে মেলে না। ব্যক্তি খাতের যে বিনিয়োগের হার ধরা হয়েছে, তা এমন ঋণ প্রবাহ দিয়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে বোধগম্য নয়।’
ফাহমিদা বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন। আমাদের আমদানিকৃত দ্রব্যের মূল্যস্ফীতির কথা বলা হলেও বিশ্ববাজারে এখন সব পণ্যের দাম নিম্নমুখী। তাই মূল্যস্ফীতিকে এর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, আমাদের অভ্যন্তরীণ অনেক দুর্বলতা আছে, করকাঠামোর মধ্যে আছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও মনিটরি পলিসির মধ্যেও দুর্বলতা আছে। মুদ্রানীতির সঙ্গে আমাদের আর্থিক নীতির যদি সমন্বয় না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন হবে।’
দুই হাজার টাকা কর বৈষম্যমূলক : করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করাকে ভালো বলে উল্লেখ করেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক। তবে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা করারোপের বিষয়টি ভালো হয়নি বলে তার মতে। তিনি বলেন, ‘কারও আয় যদি সাড়ে তিন লাখের নিচেও হয়, তাহলে সরকারি ৩৮টি সেবা নিতে টিন লাগবে। করযোগ্য আয় না থাকলেও তাকে দুই হাজার টাকা দিতে হবে। মানুষকে স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয় বাড়িয়ে আবার যার করযোগ্য আয় নেই, তার ওপর দুই হাজার টাকার কর আরোপ করা যুক্তিযুক্ত নয়। এটা বৈষম্যমূলক। নৈতিকভাবে ঠিক নয়। এতে অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে।’