চরম লোডশেডিংয়ে গরম ফ্রি!

বেশিক্ষণ জ্বলতে পারার সক্ষমতায় মোমবাতি হারিয়ে দিচ্ছে বিজলিবাতিকে। মানবসৃষ্ট মোমবাতির এ বাহাদুরিতে বিজলিবাতি লজ্জা পাক, না পাক; মানুষের গুরুচরণ দশা। তার ওপর প্রকৃতিসৃষ্ট গরমের দাপট। এ দাপট কবে কমবে কবে যাবে? ঠিকঠিকানা নেই। ধারণা করেও কোনো সুসংবাদ দিতে পারছে না আবহাওয়া বিভাগ। সচরাচর আবহাওয়া অফিস একটু বেশি দিন হাতে রেখে হলেও তাদের মতো করে রোদ-বৃষ্টি, বন্যা-খরা বিষয়ক একটা ভালো আভাস দেয়। এবার তাপপ্রবাহের সংবাদের ব্যাপারে ভিন্নতা। তাদের সর্বশেষ বার্তা হচ্ছে, ‘সপ্তাহখানেক পর বলা যাবে’। মানে, তাপপ্রবাহের এ তেজ আরও সপ্তাহ খানেক তো আছেই। এরপর বলা যাবে, আরও কতদিন থাকবে?

গরমের জন্য এখন পর্যন্ত রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করার জো ওঠেনি। অথবা বিরোধী দল বলছে না, এটা সরকারের ব্যর্থতা। সরকারও বলেনি, বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র। দমফাটা রোদ, ছাতিফাটা গরমের এ আজাবের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিং। এ বিষয়ক আভাস আরও গোলমেলে। শিগগিরই, সহসা, দ্রুত ধরনের শব্দ শোনানো হচ্ছে। কত দিনকে  শিগগিরই, সহসা, দ্রুত বলা হয়; অভিধানেও এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। বিদ্যুৎ বিভাগেরও নিজস্ব ব্যাখ্যা নেই, যুক্তি আছে। তা হলো রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধ ও বৈশ্বিক কারণে বিদ্যুতের এমন ভোগান্তি বলে দাবি সরকারি মহলের।  

দাবির পক্ষে যুক্তি আছে। তবে, চলমান লোডশেডিংকে গুজব বলার সুযোগ নেই। বিদ্যুতের এমন একটা অবস্থার আভাস বা শঙ্কা ছিল অনেকদিন থেকে। কিন্তু, সরকারি মহল থেকে চড়া-কড়া ভাষায় দাবি করা হয়েছে, এগুলো গুজব-অপপ্রচার। ওই আভাস তথা শঙ্কাকে আমলে নিলে আজকের পরিস্থিতি নাও হতে পারত। কারণ তখন পর্যন্ত সরকারের হাতে তা সামলানোর সক্ষমতা ও রসদ ছিল। তাই বলে এখন আর সক্ষমতা নেই? আছে, তবে আগের মতো নয়। ফাঁকফোকরে গোটা পাওয়ার সেক্টরে ঢুকে গেছে অন্য পাওয়ার। সতর্কতা, আভাস, শঙ্কাকে অপপ্রচার-গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ায় মওকা পেয়েছে এ সেক্টরের ধরিবাজরা।

এ পাওয়ার কেবল বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেল নয়; চারদিকের আরও নানা পাওয়ারের সংযোগ এখানে। দেশি-বিদেশি, সরকারি-অসরকারি। যোগ হয়েছে রাজনীতি-কূটনীতির কত উপাদানও। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি থাবা নতুন নয়। এ থাবা বাবাদের কাছে এটি লুটের তেলতেলে সেক্টর। ঋণ, আমদানি, বিদেশি নির্ভর এবং প্রাণ প্রকৃতি বিনাশী ফর্মুলা খাইয়ে দেওয়ার ম্যাজিক জানে এরা। বিভিন্ন দেশে এদের অনেক জাত ভাই ও ছা-পোনা রয়েছে। দেশে দেশে সরকারগুলো তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। আর বিপদে পড়লে তাদের বাতলে দেওয়া অজুহাত শোনায়-চিবায়। জাবর কাটার মতো আওড়ায়। চিবানোটা আবার মানুষকেও খাওয়ায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দের সিংহভাগ হাতানোর রাস্তা নিশ্চিত করে এখন বগল বাজাচ্ছে। দায় এবং বদনাম টানছে সরকার। দেশে-দেশে এ সেক্টরের মাফিয়ারা এমনই করে। অন্যান্য সেক্টরের মাফিয়াদেরও এটা হাল কৌশল। কোনো সমস্যা দেখা দিলেই একে বৈশ্বিক সমস্যার ছাপ বলে চালানোর এন্তার বুদ্ধি তাদের। দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং অব্যবস্থাপনাও বৈশ্বিক সমস্যা। সব কিছু বৈশ্বিকের ঘাড়ে দিয়ে নিজেদের লুটপাট, অবৈধ অর্থ উপার্জন ও দুর্নীতিকে আড়ালে রেখে এখন পর্যন্ত সফল হয়ে চলছে। বাকিটা ভবিষ্যৎ।

এখন আর তখন বলে কিছু দাওয়াই তারা দিয়ে রাখে। এখন এ অজুহাত শেখানোরা তখন রাজকীয় আয়োজনে দেশকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের উৎসব পর্যন্ত করিয়ে ছেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড গড়ার খুশিতে আতশবাজিসহ কী না করা হয়েছে? সেই টাকার হিসাব কই? দেশে বিদ্যুতের অভাব নেই, রপ্তানি করা যাবে, মহল্লায় ফেরি করে বিদ্যুৎ বেচা যাবে ধরনের কথা পর্যন্ত গিলিয়েছে। লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতার মাত্রা সরকারের জানার-বোঝার বাইরে রাখার ব্যবস্থাও তাদের আছে। আবার সরকারের পক্ষেও আর সম্ভব হয় না প্রকৃত হিসাব বের করার। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে, সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া চলছে। ডলার সংকটে কয়লা আমদানি করতে না পারায় বন্ধ থাকছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধের উপায় নেই। ডলার সংকটে চাহিদা মতো কয়লা-এলএনজি-তেল আমদানি করতে না পারায় বন্ধ রাখতে হচ্ছে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র। আবার ডলারেই আমদানি করা হচ্ছে বিদ্যুৎ। গ্যাস অনুসন্ধান ফান্ডের টাকা দিয়ে অনুসন্ধান না করে, ডলারে আমদানি করা হচ্ছে এলএনজি। ডলার সংকটে কয়লার দাম পরিশোধ করতে না পারায় গর্বের পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে শুনতে হচ্ছে এখন কুসংবাদ।  এক অদ্ভুত চক্রে আটকে ফেলা হয়েছে সরকারকে। দেশকেও। আর মানুষকে মনমগজে করে ফেলা হয়েছে আউলাঝাউলা।

এক আনলিমিটেড সার্কাসে ফেলে দেওয়া হয়েছে মানুষকে। গরমের সঙ্গে ফ্রি লোডশেডিং, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোথাও কোথাও ৩ ঘণ্টাও বিদ্যুতের দেখা না পাওয়া, মাস শেষে আরও বাড়তি বিলের ধোলাই, নতুন গ্যাস-কয়লা ক্ষেত্র আবিষ্কারের খোশখবরের চক্কর। গরমের জোর, লোডশেডিংয়ের তোড় দুয়ে মিলে মহাযন্ত্রণা সইতে সইতে যন্ত্রণাকাতর মানুষ হয়ে গেছে এক একজন মহাশয়। বিদ্যুৎ বিভাগ বাংলার মানুষকে রাত-বিরাতেও সজাগ রাখছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ আসার সময়টায় মোমবাতি আর দিয়াশলাই খোঁজার সুযোগ হচ্ছে। যেন ‘জেগে থাক বাংলাদেশ’ স্লোগানের বিকৃত বাস্তবায়ন। গরম বিলাসে বাঁধার মতো বিদ্যুতের এমন এলাম-গেলাম কাণ্ডকীর্তি নিয়তির মতো সইতে সইতে সর্বংসহা হওয়া গৌরবের না লজ্জার?

এরপরও একদিকে কথার বড়াই, আরেকদিকে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে মওকা হাসিলের দৌড়। সরকারও যেন সেখানে লাগাম টানতে পারছে না। কারও ব্যর্থতা, কারও কুকর্ম ঢাকতে মিসাইলের মতো দোষের বোমা ছোড়া হচ্ছে রুশ-ইউক্রেন অভিমুখে। আর বৈশ্বিক শব্দটির দিকে। কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুতের বিরুদ্ধে উচ্চকিত উন্নত দেশগুলো। বাংলাদেশের ভেতরেও টুকটাক কিছু কথা রয়েছে। তোপখানা-প্রেস ক্লাব এলাকায় লাল কাপড়ের কিছু কর্মসূচি পালন হয়। ধনে-জনের কমতিতে রাস্তায় তাদের আমল কমের চেয়েও কম। বিশ্বের ধনী কিছু দেশ প্রতি বছর জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে ২ হাজার ১৩০ কোটি টন বা ২১.৩ বিলিয়ন টন কার্বন উৎপাদন করে প্রকৃতি-পরিবেশে ছড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ তখন অন্ধকারে আলোর দিশা হওয়ার কথা। কিন্তু, ভেতরটা বড় চাতুরতায় ভরা। এ লালবার্তাগুলো দিতে চাচ্ছে তারা। কিন্তু কুলাতে পারছে না। তারপরও সরকার এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের নানা প্রকল্প দেখাচ্ছে। সেখানেও বেশ চাতুরী। পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের বদলে প্রতারণামূলকভাবে লুটেরা দখলদার গোষ্ঠীকে জমি দেওয়া, উচ্চ দরের চুক্তিতে তাদের বিপুল উচ্চ ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করার কিছু বিষয়াদি সেখানে রয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশী এসব কথিত প্রকল্প গরম, খরা, বন্যা আরও কত কিছুই ফ্রি দেবে? এখন অনেকের তা ভাবনার বাইরে। আর জেনে-বুঝে কর্মসারা করার লোকেরা বেশ আগোয়ান।

প্রাণ-প্রকৃতি ছারখারের যত আয়োজন আছে বা থাকতে পারে তার সবই করে ছাড়া হচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত পরিবেশের যত ধরনের সর্বনাশ রয়েছে তার কোনোটা আর তেমন বাদ নেই। পরিচ্ছন্নতার নামে রাজধানী ঢাকার হাতেগোনা কিছু গাছও না রাখার মানসিকতার নোংরা প্রকাশ দেখছে মানুষ।  বিশ্বের বিষাক্ত বা নিম্নমানের বাতাসের নগরীর তালিকার শীর্ষস্থানে বারবার উঠে আসছে ঢাকার নাম। সামনের দিনগুলোতে নিরিবিলি পল্লীর বাতাস বরবাদ করার আয়োজনও জোরদার। উন্নয়নের নামে যাচ্ছেতাই কাণ্ড বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, নদী-খাল দূষণ, প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ, পানিদূষণ, বর্জ্যদূষণ, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যায় ঢাকাকে জর্জরিত করতে কারও চেয়ে কেউ পিছিয়ে থাকছে না।

বাংলাদেশের জন্ম নদীর পানিপ্রবাহের ওপর। নদী বিপন্নের সমান্তরালে এখন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক অস্তিত্বই বিপন্নের পথে। নদী হারানোর সর্বনাশ এক-দুই বছরে, এক-দুই দশকে বোঝা যায় না। ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছোট নদী, শাখা নদীর সংখ্যা বাংলাদেশে আগে ছিল সহস্রাধিক। এখন কোনো মতে বেঁচে আছে দুই শতাধিক। দখল-দূষণসহ একতরফা অবিরাম আক্রমণে দেশের অসংখ্য ছোট নদী এখন একেকটি মৃতদেহ। এর কঠিন পরিণাম ভুগছে বাংলাদেশ।

গড় আয়ুসহ কিছু সূচকে আমাদের অগ্রগতি অনেকটা বিরতিহীনভাবে চলমান। ধাবমানও। তা কারও দয়ায় নয়, আপনাআপনিও নয়। এর পছনে লুকিয়ে আছে ইতিবাচক নানা কারণ। সমালোচনা-অতৃপ্তি থাকলেও আমাদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার উন্নতি হয়েছে। কমেছে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার। কমের মধ্যেও জনসচেতনতা বেড়েছে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি, ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যাওয়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উন্নতিও এর পেছনের একেকটি মোটা দাগের কারণ। এসবের রসায়নে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়তে বাড়তে এখন ৭২.৮ বছরে উন্নীত হয়েছে। সামনে তা আরও বাড়বে, সেই আশা জাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু, অবিরাম বায়ু, শব্দ, পরিবেশসহ নানা দূষণ আমাদের বর্ধিষ্ণু আয়ুতে টান ফেলা শুরু করেছে। 

নদী-নালা, খাল-বিল, জনপদ মিলিয়ে গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশেও করোনা-কলেরা থেকে যক্ষ্মা-ক্যানসারের মতো রোগবালাই ছড়ানোর সব উপাদান সেখানে ধাবমান। বন্যা-খরা, ঝড়-তাপপ্রবাহের যাবতীয় কারণ বিদ্যমান। কেবল খরা, তাপপ্রবাহ, অগ্নিদাহ নয়; সময়ে-অসময়ে  ভূমিকম্পের মতো সর্বনাশের শঙ্কাও জোরদার এই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে। কিন্তু, দিব্যি এর দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রকৃতির ওপর। এর মধ্য দিয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক লীলার পেছনে মানুষের অপকর্মকে আড়াল করে দেওয়া হচ্ছে। ঠিক যেমনটি চলছে বিদ্যুতের জন্য সুদূরের রুশ-ইউক্রেন বা বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর। চাতুরী-চালাকির মানদণ্ডে তা উত্তীর্ণ হতে পারে। দেশের, দশের, মানুষের সর্বনাশের জন্য তা নির্মম কলঙ্কের। যা সামনে আমাদের মানবসৃষ্ট ও প্রকৃতিসৃষ্ট আরও কত বোনাস বা ফ্রি নিশ্চিত করবে, শঙ্কা না জেগে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

mostofa71@gmail.com