জুলাই মাস। দুবছর আগে এই জুলাই মাসেই সংঘটিত ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। রাষ্ট্র ও সরকার কাঠামোর মূলে আঘাত হানে ওই আন্দোলন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক পর্যন্ত বদলে দেয় ওই আন্দোলন। যদিও দেড় বছরের মধ্যে বাংলাদেশে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও সবকিছু এখনো ঠিকটাক হয়ে ওঠেনি। এরই মাঝে আবার শিক্ষার্থীরা মাঠে। ওই যেন একই কায়দার আন্দোলন। এবারের আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ‘হিরো’ শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর ওপর সরকার ও জনগণের প্রত্যাশা ছিল প্রচুর। আমাদের শিক্ষার প্রতিটি স্তরে তিলে তিলে ছাপ পড়েছে ধ্বংসের। প্রত্যাশা ছিল শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার তা থেকে উত্তোরণ ঘটিয়ে একটি যোগ্য, দক্ষ, মানবিক শিক্ষিত যুবসমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
আমাদের দেশের জনমিতিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় যেসব শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের সম্মিলিত সংখ্যা বিশ্বের অন্তত একশর মতো দেশের জনগণের থেকে বেশি। বিশ্বে অন্তত একশর মতো দেশ আছে, যেসব দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরা এত চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকেন না, আমাদের দেশের শিক্ষামন্ত্রীকে যতটা চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত মন্ত্রণালয়। ২০২৪-এর জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এক মন্তব্যে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিণতি খুব অপ্রীতিকর এবং সৃষ্ট ক্ষত এখনো শুকায়নি। অনেকেরই মন্তব্য, দেশ স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা পেছানোর শিক্ষার্থীদের দাবিতে বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলেছে শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যটি । তার মন্তব্যের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং মন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। যদিও মন্ত্রী তার মন্তব্যের জন্য সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারপরও শিক্ষার্থীরা শান্ত হয়নি।
এরই মাঝে ২০২৪ সালে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নীতিনির্ধারকরা এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে সারাদেশে তাদের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু বন্যাকবলিত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী যাতায়াত সংকট, শিক্ষাসামগ্রী নষ্ট হওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার মতো নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের শামিল। তারা টানা বৃষ্টি, তীব্র জলাবদ্ধতা ও দেশের কিছু অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কারণে দুর্যোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে গত ১৩ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের জন্য আবারও পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সহজ সমস্যাটি জটিল হয়ে গেল। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ১-২টি পরীক্ষা পরে নিলে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের কী এমন ক্ষতি হতো? এইচএসসি পর্যায়ে এমনিতেই শিক্ষার্থীর অনেক সময় নষ্ট হয়। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্যদের নিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ক্লাসই শুরু করতে পারেনি। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশন হচ্ছে। হ্যাঁ, সরকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সময় আর নষ্ট না করতে অনেক আন্তরিক। কিন্তু এটি করতে গিয়ে সাপে বর হয়ে গেল। চলমান পরীক্ষার আগে শিক্ষামন্ত্রী সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা সম্পন্নের লক্ষ্যে সারা দেশে সভা করেছেন। অথচ ভুল থেকে গেল প্রশ্নপত্রে। যদিও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড প্রশ্নপত্রের ভুলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না সে ঘোষণা ইতোমধ্যে দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রীও বৈরী পরিবেশে সম্পন্ন পরীক্ষার ব্যাপারে ইতিবাচক ঘোষণা দিয়েছেন। তারপরও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বুধবার সকাল ১০টা থেকে সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। রুটিন অনুযায়ী আটটি সাধারণ বোর্ডে পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যার দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে বৈরী পরিবেশ ও মানসিক চাপের মধ্যে পরীক্ষা দেওয়া অসম্ভব উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অনেকে আবার রাত পর্যন্ত মিছিল-মিটিং করে পরীক্ষায় বসেছে। তাদের প্রস্তুতি স্বাভাবিকভাবে ভালো হওয়ার কথা নয়।
আন্দোলন কোন দিকে যাবে তা কেউ অনুমান করতে পারছি না। শিক্ষাব্যবস্থা ও মানব সম্পদের যে বিশাল ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তা কি দায়িত্বশীলরা ধারণা করতে পারছেন? এসএসসি ও এইচএসসি দেশের বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে এইচএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষা কেবল একজন শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং দেশের উচ্চশিক্ষার গেটওয়ে। মানবসম্পদের উন্নয়ন ও গুরুত্ব বিবেচনায়ও এ স্তরের শিক্ষার্থীরা আমাদের পুরো অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তাদের জন্য রয়েছে ৫৯টি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়, ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া রয়েছে সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৮টি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ৬৮টি, সেনাবাহিনী পরিচালিত মেডিকেল কলেজ ৭টি, সরকারি ডেন্টাল কলেজ ৯টি, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ ২৪টি, সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউট ৩৮টি, সরকারি নার্সিং কলেজ ৭টি, পোস্ট-বেসিক সরকারি নার্সিং কলেজ ৪টি। জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ২ হাজার ২৮৩টি কলেজে প্রায় ৩২ লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স, মাস্টার্স, ডিগ্রি পাস কোর্সে লেখাপড়া করে। দেশে আরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনুমতি মিলবে। এরই মধ্যে ঢাকায় একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস চালু হয়েছে। অনেকগুলো পাইপলাইনে রয়েছে। আবার আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি বছর লাখের কাছাকাছি বিদেশে চলে যাচ্ছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে কিংবা জীবন-জীবিকার তাগিদে। তরুণদের যোগ্য ও দক্ষ করতে সরকার ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগও লক্ষণীয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। এটি ইতিবাচক। কিন্তু গাছের শিকড়ে মাটি আছে কিনা তা না দেখে শিখরে পানি ঢাললে সেই গাছের সজীবতা ফিরে আসবে না এবং গাছটি একসময় মরে যেতে পারে বা নুয়ে পড়তে পারে। আমাদের শিক্ষার অবস্থাও সেরকমই।
২০২৬ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু এর মধ্যে সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেননি। আবার যারা ফরম পূরণ করেছে তাদের মধ্যে লাখের ওপর পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মাঝে পরীক্ষা হওয়া-না হওয়া নিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন। বিগত সরকারের সময় গণপাস এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অটোপাসে আমাদের উচ্চশিক্ষার ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এরই মাঝে ১৫ লাখের মধ্যে সাড়ে ৯ লাখ পরীক্ষার্থী নিয়ে আয়োজিত পরীক্ষায় ইতিমধ্যে লাখের ওপর অনুপস্থিত! এরপর আসবে পাস-ফেল। অপরদিকে এসএসসি পর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণেচ্ছুক প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করলেও পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে সাড়ে ১৪ লাখ। বাকি শিক্ষার্থী কোথায় আছে, কী করছে জানা নেই। আমরা জনমিতিক সুবিধা বা ডেম্যুগ্রাফিক ডেভিডেন্টের কথা বলি। একটি রাষ্ট্রে যখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল মানুষের তুলনায় বেশি থাকে সে অবস্থা হলো ওই রাষ্ট্রের জন্য জনমিতিক সুবিধা। এ মুহূর্তে বাংলাদেশসহ আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশ এ সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি তরুণ ও কর্মক্ষম। শিক্ষা ও দক্ষতার বিনিময়ে এদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়। এদের কাছ থেকে উপযোগ আসে। এরা সম্পদ। এটিই হলো বাংলাদেশের জন্য জনমিতিক সুযোগ ও সম্ভাবনা, পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও। কিন্তু জনমিতিক সুবিধা কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনে না, বরং কর্মক্ষম মানুষকে শিক্ষিত ও দক্ষ করে কাজে লাগাতে হয়। ব্যর্থ হলে তা উল্টো জনমিতিক বোঝা বা ডেম্যুগ্রাফিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য তরুণ জনগোষ্ঠী জনমিতিক সুযোগ; নাকি জনমিতিক বোঝা হবে তা নীতিনির্ধারকদের ঠিক করতে হবে। এভাবে লাখ লাখ তরুণ শিক্ষা ও দক্ষতার বাইরে থাকার অর্থ হলো দেশের জন্য তারা সম্পদ নন, বরং বোঝা।
আমরা চাই রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষত আর না বাড়ুক, বরং কীভাবে তা দ্রুত উপশম করা যায় সেটাই হোক লক্ষ্য। ক্ষমতা-দম্ভ-অদূরদর্শিতা ক্ষমতার শত্রু-মিত্র দুই-ই হতে পারে এর নজির আমাদের সামনে কম নেই। দায়িত্বশীলদের তা মনে রাখা উচিত, একই সঙ্গে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সব মহলসহ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমান্তরালে অতি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখা জরুরি, খুব জরুরি; শিক্ষা নিয়ে আমরা যাচ্ছি কোন দিকে। যে দিকে যাচ্ছি সেই দিকটা বর্তমান-ভবিষ্যতের জন্য কতটা কল্যাণকর? এই প্রশ্নের উত্তরটা যেন সবাই সন্ধান করি।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক। উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।