বিভাজনের রাজনীতি কমবে না

প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন ভিসানীতি বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে? এক্ষেত্রে কতগুলো জিনিস দেখা দরকার। একটা হলো মার্কিন ভিসা রেস্ট্রিকশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম না। তারা বেশ কতগুলো দেশের ওপর ভিসা রেস্ট্রিকশন বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে। তাতে সেই দেশের রাজনীতি ও পরিস্থিতির যে খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে সেটা বলা মুশকিল। আমাদের পাশের দেশ মিয়ানমারের ওপরও এরকম রেস্ট্রিকশন আছে, তাতে যে দেশটির কোনো পরিবর্তন হয়েছে সেটা দেখা যায় না। ঠিক একইভাবে অনেক দেশ আছে যেখানে হয়তো গণতন্ত্রের কাঠামো খুবই দুর্বল। যেমন, পাকিস্তানের কথা ধরা যেতে পারে। কিন্তু সেসব দেশের বেলায় আমরা এ ধরনের রেস্ট্রিকশন দেখি না। অন্যকথায়, এটা তারা যে খুব চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে এটা করেই তা আমার কখনই মনে হয়নি। কারণ, মনে রাখতে হবে, যেকোনো দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের যে বিষয় সেখানে ন্যূনতম কতগুলো বিষয় বা শর্ত থাকতে হয়। গণতন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম ডেফিসিট বা ঘাটতি বিভিন্নভাবে আছে। কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এক ধরনের ঘাটতি আছে। আবার অন্য দেশে সেই ঘাটতিটা অন্য ধরনের। কথা হচ্ছে, সেটা বাইরের একটা ফোর্স এসে কি সমাধান করতে পারবে? আজ আমেরিকার গণতন্ত্রের যে ঝামেলা সেটা কি বাইরের কোনো শক্তি তার সমাধান করতে পারবে? আমার মনে হয় না। এটা ওই দেশের জনগণকেই সমাধান করতে হবে। এখন ন্যূনতম শর্ত যেটা, সেটা বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেন আস্থা থাকে। পশ্চিমা কাঠামোতে যেই নির্বাচনের কথা বলা হয়, আমাদের দেশেও যেহেতু ব্রিটিশদের হাত ধরে সেটা এসেছে; সেখানে বড় বড় পার্টিগুলোর মধ্যে আস্থা থাকতে হবে। দেশের বড় বড় দলগুলোর নিজেদের মধ্যে কোনো আস্থা নেই।

আমেরিকা এই যে ভিসা রেস্ট্রিকশনটা দিল, এতে কি আস্থা বাড়বে নাকি বিভাজন বাড়বে? খুব সহজে এর উত্তর হলো এখানে আস্থাটা বাড়বে না, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বিভাজনটা আছে সেটাই আরও বাড়বে। তাহলে যেই গণতন্ত্রের কথা চিন্তা করা হচ্ছে সেখানে এই বিভাজনটা যদি বাড়ে, তাহলে তো আর সেই গণতন্ত্রটা আর হয় না। তাহলে এই বিভাজন যে তারা বাড়াচ্ছে এর কারণটা কী? এটা কি তারা জেনেশুনেই বাড়াচ্ছে? ব্যবসায়িক স্বার্থ থেকে শুরু করে জিও-পলিটিক্যাল স্বার্থ, এসব পূরণেই কি ভিসানীতি বা বিভিন্ন স্যাংশন, রেস্ট্রিকশন? অনেক দেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক আছে যেখানে গণতন্ত্রের অভাব আছে।

এখন আমেরিকার ভিসানীতি ঘোষণার বড় দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নেতাকর্মীরা নানা ধরনের কথাবার্তা বলছেন। এগুলো হচ্ছে রাজনীতির কথা। কিন্তু আমি ওই রাজনীতির আলাপে যেতে চাই না। অ্যাকাডেমিশিয়ান হিসেবে আমি মনে করি না, দেশের বড় দুই দল এই মার্কিন ভিসানীতির কারণে নিজেদের মধ্যে ওই আস্থার জায়গায় আসছে বা আসবে। বিরোধী দল মনে করছে বা বলার চেষ্টা করছে যে সরকারি বা ক্ষমতাসীন দলের ওপর প্রেশার দেওয়া হয়েছে। আর ক্ষমতাসীন দল বলতে চাচ্ছে যে, আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন করব কিন্তু বিরোধী দল যেন সেখানে বাধা দিতে না পারে। আবার সরকারি দলের অনেকে এটাও মনে করছে যে, যেহেতু কেয়ারটেকার সরকারের কথা ভিসানীতিতে বলা হয়নি সেহেতু আমেরিকাও বুঝে ফেলেছে যে এই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। এবং ইলেকশন কমিশনকে এখন দেখাতে হবে যে এটা স্বচ্ছ নির্বাচন হলো কি না। সেক্ষেত্রে বিভাজন বাড়ানোর যেই রাজনীতি সেটাই চোখে পড়ছে। শেষ বিচারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যেই দুর্বলতা আছে সেটা যদি ঠিক করতে হয় ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে যে আমাদের দেশে তেমন পলিটিক্যাল স্ট্যাবিলিটি কিন্তু সেভাবে কখনই ছিল না, যেটা এবার হয়েছে বা ২০০৯ থেকে যদি বলি সেটা একটা রেজিম স্ট্যাবিলিটি হয়েছে, এটাও কিন্তু পার্থক্যকরণের দরকার। পলিটিক্যাল স্ট্যাবিলিটি বাংলাদেশে কখনই ছিল না, এই রেজিম স্ট্যাবিলিটি বা একটি গোষ্ঠীতন্ত্রের স্থিতিশীলতায় যেটা হয় উন্নয়নের কাঠামোটা করা সম্ভবপর হয়। রেজিম স্ট্যাবিলিটির কারণে উন্নয়নের একটা কাঠামো করা গেছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতি অনেকের আকর্ষণ বেড়েছে। অনেকে মনে করছে, উন্নয়নের ব্যাপারে বাংলাদেশের একটা প্রমিস আছে। পলিটিক্যাল আনস্ট্যাবিলিটি সত্ত্বেও রেজিম স্ট্যাবিলিটি থাকার ফলে উন্নয়নের যে কাঠামো বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে তাতে অনেক দেশই মনে করে এখানে উন্নয়ন সম্ভাবনা রয়েছে। এটা বিশ^ব্যাংকও মনে করে, আইএমএফও মনে করে। এবং সেই হিসেবে চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ মনে করে। কথা হচ্ছে যে এই জিনিসটাকে ধরে রাখার বিষয়। আমাদের এমন সময় এটা ধরে রাখতে হবে যখন গোটা পৃথিবীতেই একটা বড় পরিবর্তন আসছে বা ঘটছে। সেটা হলো এককেন্দ্রিক বিশ^ থেকে বহুকেন্দ্রিক বিশ^ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে পৃথিবী।

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমেরিকা যে ভিসানীতি দিয়েছে, সেখানে পুলিশ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে নির্বাচন বা সুষ্ঠু ভোটের পক্ষে প্রভাব পড়বে কি না। আমার কথা হচ্ছে, কোনো প্রভাবই পড়বে না। ধরলাম কারও কারও ছেলেমেয়ে আমেরিকায় থাকে, আমেরিকায় যাওয়াটা তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কথা হচ্ছে যে সে যদি ক্ষমতায়ই না থাকে তাহলে আমেরিকা যাওয়া না যাওয়ার কী আছে! আমাদের তো সবকিছুতেই বিভাজন হয়ে গিয়েছে। এটা কেবল রাজনীতিবিদদের মধ্যে না। ধারণা করা হয়, রাজনীতিবিদ ছাড়া অন্য পেশাজীবী যারা অবৈধ সম্পদ আহরণ করেছেন, আত্মীয়দের বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন তারা আসলে একটা সেফ এক্সিট চান। কিন্তু এটা এত সহজ না। ক্ষমতা চলে গেলে তো সে এমনিতেই সমস্যায় পড়বে। প্রশ্ন উঠতে পারে, যারা মানি লন্ডারিং করছে তাদের সেফ প্যাসেজ দিতেই এসব ভিসানীতি, রেস্ট্রিকশন কিনা। কথা সেটা না, কথা হচ্ছে যারা ক্ষমতার অবৈধ বা অনৈতিক চর্চা করছে সে তো এমনিতেই বড় প্রেশারে আছে। কারণ ক্ষমতা চলে গেলে কী হবে সেটা তার বড় চিন্তার বিষয়। এখন আমরা তো দেখছি যে নানা রকম মামলা, গ্রেপ্তার, আইনি প্রক্রিয়ায় পড়ে বিরোধীদের কী নাজেহাল অবস্থা। তখন তো সে এসবের মধ্যে পড়বে। ফলে তারা ক্ষমতাটা ধরেই রাখতে চাইবে। রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে যেমন, পেশাজীবীদের মধ্যেও তেমন। ক্ষমতাটা কেউ আসলে ছাড়তে চায় না। এটা আমি পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট হিসেবে বলছি, এটা অনেকেই বুঝতে চায় না।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের একটা বড় ভূমিকা থাকে। এখানে গণতন্ত্র নিয়ে যতগুলো পরিবর্তন হয়েছে সেগুলো কিন্তু জনগণই করেছে। সেই জনগণের ওপর আস্থা রাখতেই হবে। বাইরের কোনো শক্তি ভিসা রেস্ট্রিকশন দিয়ে বা স্যাংশন দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ঠিক করে দেবে, এটা সম্ভব না। আমি মনে করি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় পলিটিক্যাল পার্টি বা সিভিল সোসাইটির যদি ইচ্ছা থাকে, তাহলে তাদের জনগণের কাছেই যেতে হবে। এখন জনগণ কী চাচ্ছে সেটা যদি আমরা না দেখি তাহলে কিন্তু আমরা বুঝতে পারব না যে জনগণ কখন আন্দোলন করে বা কখন করে না। কেউ যদি বলে কাঠামোটা অনেক কঠিন হয়ে গেছে তাই চাইলেও জনগণ আন্দোলনে নামতে পারছে না, সেটাও ঠিক না। কারণ আমারা তো এর চেয়ে বড় সিচুয়েশন ফেস করেছি, মার্শাল ল’ দেখেছি। বিভিন্ন কাঠামো ভাঙতে জনগণ যে বাসায় বসে ছিল তা তো নয়। আমাদের যেটা বোঝা দরকার, আমরা যেভাবে গণতন্ত্রকে ডিফাইন করি সব মানুষ তো আর একভাবে গণতন্ত্রকে দেখে না। জরিপেও দেখা গেছে গণতন্ত্র বলতে তারা যতটা না নির্বাচন বোঝে, বাংলাদেশের জন্য ৫৪ শতাংশের বেশি মনে করে খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, বস্ত্রকে মানে বেসিক নেসেসিটিকে বড় মনে করে। ওই জরিপে মাত্র ১১ শতাংশ নির্বাচনকে বড় মনে করেছে। এই ১১ শতাংশের মধ্যে আবার এলিট বেশি, জনগণ কম। এর স্পষ্ট উদাহরণ হলো শ্রীলঙ্কা। দেশটির নির্বাচন নিয়ে কিন্তু কোনো প্রশ্ন করে না কেউ। ছোট দেশ, নির্বাচনও স্বচ্ছই হয়। কিন্তু তারপরও আমরা দেখেছি সেখানে পার্লামেন্টে পাবলিক অ্যাটাক করেছে, প্রেসিডেন্টের বাসায় আগুন দিয়েছে। কেন হয়েছে? কারণ দেশটির ইকোনমি যেভাবে ধসে পড়েছিল তাতে মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ভিসা রেস্ট্রিকশন দিয়ে কি এটা করা যাবে? বা স্যাংশন? আমেরিকায় আমাদের যে মার্কেট, গার্মেন্টস প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে, এটা তারা দয়া দেখিয়ে করেনি। মনে রাখতে হবে এটা একটা ক্যাপিটালিস্ট বিশ^। সেই প্রিন্সিপাল মেনেই সেখানে আমাদের মার্কেট হয়েছে। ভারত, চীন, ভিয়েতনামের থেকে আমদানির চাইতে বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিলে তাদের প্রফিট বেশি, বিষয়টা খুবই পরিষ্কার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই যে বার্মা অ্যাক্ট করল আমেরিকা সেখানে তারা একসেপশন ক্লজ রেখেছে যে কোনোভাবেই বার্মার ইমপোর্ট থামানো যাবে না। কারণ, আমেরিকার ব্যবসায়ীদের স্বার্থ। সবশেষে যেটা বলতে চাই, আমেরিকার উদ্দেশ্য হয়তো সৎ আছে, যে তারা চায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হোক। কিন্তু এই ভিসানীতি যেভাবে তারা দিয়েছে, সেখানে তেমন চিন্তাভাবনা তাদের ছিল বলে মনে হয় না। আর আমাদের যেটা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন কমাতে হবে, আস্থা বাড়াতে হবে। এই বিভাজন রেখে বাংলাদেশে যেই গণতন্ত্রের কথা বলা হয় সেটা আসবে না। এখানে আমাদের যেমন নতুন চিন্তাভাবনার অভাব আছে, তেমনি বিদেশিরাও এই জায়গাতে ফোর্স করছে না। তাতে হচ্ছে কি, বিভাজনটা বাড়ছে।