দখল-দূষণ আর দায়িত্বহীনতা সমান্তরালে

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

গত রবিবার, সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর  বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হলো বিশ্ব নদী দিবস। বিশ্বের একশ’রও বেশি দেশের মানুষ নদীর গুরুত্ব, নদীর প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা এবং নদী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এ দিবসটি পালন করেছে। বাংলাদেশের যেহেতু দিবসটি রাষ্ট্রীয় বা সরকারি দিবস হিসেবে এখনো ঘোষণা করা হয়নি, তাই মূলত বেসরকারি বিভিন্ন পরিবেশবাদী  সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিবসটি পালন করেছে। পত্রিকাগুলো গুরুত্ব সহকারে নদ-নদীর বাস্তবতা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আর এর মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে আমাদের দেশের নদ-নদীর বিদ্যমান গভীর সংকট-চিত্র। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশে নদ-নদীর অবস্থা ভালো নেই, এর চেয়ে হতাশার খবর আর কী হতে পারে?

এ মুহূর্তে আমাদের দেশের নদীগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট হলো দখল ও দূষণ। নদীর তীর, চর, প্লাবনভূমি ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জায়গা দখল করে গড়ে উঠছে বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও নানা স্থাপনা। বিশ্ব নদী দিবসে দেশ রূপান্তর-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নদীর সীমানা দখল করে গড়ে উঠছে স্থাপনা। কোথাও নদী ভরাট করে বদলে দেওয়া হচ্ছে গতিপথ। শিল্পবর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন ও কঠিন বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পানি। কোথাও আবার নাব্য হারিয়ে সরু হচ্ছে নদী। ফলে একদিকে কমছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জল ধারণক্ষমতা, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে মাছসহ জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। নদী হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা’। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশে নদী দিবসের সংবাদ হওয়ার কথা ছিল সম্ভাবনার, উচ্ছ্বাসের; হতাশার নয়। কিন্তু কিছু মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকা- আর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব পালনে ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণে বর্তমানে দেশের নদ-নদীর অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। 

আমাদের দেশে একসময় দুই হাজারেরও বেশি নদ-নদী ছিল। জালের মতো ছড়িয়ে ছিল (বর্তমানেও আছে) নদীগুলো। কিন্তু বর্তমানে এর সিংহভাগের চিত্র খুব বিবর্ণ; যা জীবনজীবিকা ও পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য প্রকট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে মোট নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১৫টি। তারপরও দেশের এমন কোনো জনপদ নেই যার সঙ্গে নদী জড়িয়ে নেই।  এটি যেমন সত্য তেমনি এটিও আমাদের নির্মম বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশই  বিশ্বের একমাত্র দেশ যে দেশ গর্ব করে বলতে পারবে না তাদের অন্তত একটি নদ কিংবা নদী ভালো আছে, দখল-দূষণমুক্ত আছে। নদীমাতৃক দেশে নদীর এই অবস্থা সংগতই বহুবিধ প্রশ্ন দাঁড় করায়। আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ প্রাণ প্রকৃতির মূল আধার হচ্ছে এই  নদ-নদীগুলো, তা যেন গ্রন্থভুক্ত বিষয় শুধু! আমাদের ভূপ্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদীগুলো গভীরভাবে যুক্ত। পরিবেশ সংরক্ষণে বা পরিবেশের উন্নয়নে যতই গাছ লাগাই না কেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় নদ-নদীর গুরুত্ব অস্বীকার করা দুরূহ। মূলত এই নদ-নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। এ সত্য আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ও নীতিনির্ধারকরা যত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবেন ও সেই নিরিখে যত দ্রুত সম্ভব এগুলোর প্রাণ বাঁচাতে যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন ততই মঙ্গল। এ নিয়ে কথা কম হয়নি, হচ্ছেও; কিন্তু সবই যেন নিষ্ফল উচ্চারণ!

আমাদের  নদ-নদীর সংখ্যা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা পরিসংখ্যান প্রচলিত।  নদ-নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগ একেক সময় একেক তথ্য উপস্থাপন করে। আরও লক্ষণীয়, সরকার পরিবর্তন হলে নদীগুলোর হালনাগাদ তথ্য দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। অনস্বীকার্য যে, হালনাগাদ তথ্য থাকা ভালো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো কোনো একটি হালনাগাদ তথ্যে নদীর সংখ্যা বাড়েনি; বরং কমেছে। যদিও আমরা সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে সারা বছর নদী উদ্ধারে তৎপর থাকতে দেখি। প্রকল্প গ্রহণ করতে দেখি, বাজেট তৈরি করতে দেখি; কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতেও শুনি। কিন্তু এগুলো কেবলই যেন হম্বিতম্বি। দেশের নদীরক্ষা কমিশনকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিশ্বের কোনো দেশের নদীর রক্ষার দায়িত্বে থাকা কোনো বিভাগ বা দপ্তরের এত ক্ষমতা নেই। আমাদের দেশে নদীরক্ষায় যেসব আইন ও বিধি রয়েছে অন্য কোনো দেশের নদীরক্ষায় এমন শক্তিশালী আইনকানুন অনেক দেশেই নেই। কিন্তু আইন দিয়ে কী হবে যদি দুষ্কর্মের প্রতিবিধান আইনানুগ না হয়! অপরদিকে বাংলাদেশ হচ্ছে একমাত্র দেশ যে দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে বুক উঁচু করে বলতে পারবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এ রকম নির্দেশনা বিশ্বের কোনো আদালত দেয়নি। নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা ধরে বিশ্বে যখন বিস্তর গবেষণা হচ্ছে, তখন যে দেশ নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করল সে দেশের নদ-নদীগুলোকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। অনেক ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, এ-গুলো কিংবা ও-গুলো মরা নদী; যদিও নদ-নদী কখনো মরে না। আমাদের নদ-নদীর সংখ্যা কত এ প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এসব নদ-নদী কতটা জীবন্ত, প্রবহমান ও জনবান্ধব হিসেবে প্রবহমান আছে? নিশ্চয় উত্তর প্রীতিকর নয়। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে ফের সেই চিত্রই উঠে এসেছে।

নদ-নদী দখল ও দূষণকারীর একমাত্র পরিচয় তারা দেশ-জাতির শত্রু। কিন্তু তারা নানাভাবে অনুকম্পা পাচ্ছে, দুষ্কর্ম থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছে এ অভিযোগ পুষ্ট। কীভাবে তারা ছাড় পাচ্ছে, কীভাবে দখলমুক্ত করার পরই আবার দখল হয়ে যাচ্ছে এই প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার দায় দায়িত্বশীলরা কি এড়াতে পারেন? জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন ২১ হাজার ৯৮৮ দখলদারের তালিকা তৈরি করেছে। ২০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে ২২ হাজার দখলদারের কাছে আমরা জিম্মি, তা কি চিন্তনীয়? দখলের বাইরে আমাদের দেশের নদ-নদীগুলোর আরেক সংকট হলো দূষণ। শিল্পকারখানা, গৃহস্থালি, পয়ঃবর্জ্যে দেশের নদীগুলোর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য নদীর তলদেশে জমাট হয়ে নদীর নাব্যই কেবল কমায়নি, নদ-নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে বহুমুখী বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্পায়নের গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। আবার আমাদের টিকে থাকার জন্য নদ-নদীর প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। বিশ্বের উন্নত ও সভ্য দেশগুলো নদ-নদীর সুরক্ষা নিশ্চিত করেই শিল্পায়ন  করেছে।  আমাদের দেশে শিল্পায়ন হতে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এসেছে আর এর বিপরীতে শিল্পবর্জ্যরে দূষণের কারণে নদ-নদী প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে এর মূল্যর মধ্যে পার্থক্য কত বিস্তর তা কি দায়িত্বশীলরা হিসাব কষে দেখেছেন? উন্নত বিশ্বে নগরায়ণ হয় নদ-নদীকে ঘিরে। আমাদের দেশেও নগরায়ণ হয়েছে নদ-নদীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এক্ষেত্রে ফারাকটি হলো উন্নত দেশসমূহ নদীকে সংরক্ষণ করেছে, আর আমরা নদীগুলোকে ধ্বংস করে নগর গড়ে তুলেছি। এটি নিজেদের অস্তিত্ব ধ্বংসের নামান্তর। কোনো সভ্য দেশের নাগরিক নগরের বর্জ্য নদীতে ফেলতে পারে না। রাজধানী ঢাকার চারদিকে নদী, রাজধানীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নদী। অথচ কোনো একটি নদী দুর্গন্ধমুক্ত নয়।

দখলে দূষণে নাব্য হারিয়ে নদ-নদীগুলো জীর্ণশীর্ণকায়। কোথাও কোথাও যেন ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আন্তঃসংযুক্ত জলপথে ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও বর্জ্যপানি প্রবাহিত হয়। একই সঙ্গে ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল হারিয়ে গেছে অথবা আবর্জনা ও দূষণে বন্ধ হয়ে আছে। অথচ এগুলো হতে পারত নগরের চারদিক ও নগরের ভেতর দিয়ে যোগাযোগের মাধ্যম। নদীগুলো হতে পারত উন্নতি আর বিনোদনের অন্যতম ক্ষেত্র। নগরের পরিবেশ থাকত নির্মল ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত উপদেষ্টা ঘোষণা করেছিলেন, প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি নদী দখল দূষণমুক্ত করা হবে। এ জন্য প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। কোনো কোনো জেলায় কাজও শুরু হয়েছিল। বর্তমান সরকারের কাছে প্রত্যাশা এ কাজের  ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন। বিবেচনা রাখতে হবে, খালকাটা কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করছে নদীর অস্তিত্বের ওপর। দেশের নদ-নদীগুলোকে সুরক্ষিত না রেখে শত শত বা হাজার হাজার খাল কাটলে কিংবা কোটি কোটি গাছ লাগালেও কাক্সিক্ষত সুফল মিলবে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, সমন্বয়হীন নদী ব্যবস্থাপনা। নদীর সঙ্গে পানি, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, পরিবেশ, নগরায়ণ এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা সরাসরি যুক্ত। কিন্তু তাদের কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগও নতুন। প্রশ্ন হচ্ছে, এতসব নেতিবাচকতা জিইয়ে ইতিবাচকতার দুরাশা বৈ কিছু নয়। এমনটি তো কাম্য হতে পারে না।

দেশের অভ্যন্তরে দখল-দূষণের পাশাপাশি নদ-নদীর তথা জলরাশির বিপর্যয় ডেকে আনছে অপরিকল্পিত বাঁধ। আন্তর্জাতিক বাঁধ ও দেশের অভ্যন্তরে নির্মিত অপরিকল্পিত বাঁধ এবং নদ-নদী থেকে ধারণক্ষমতার বাইরে পাথর ও বালু উত্তোলন, অবাধ দখল-দূষণ না থামালে নদ-নদীর সংকট দূর হবে না। আর নদ-নদীকে সংকটে রেখে আমরা পরিবেশ সংকট থেকে বের হতে পারব না।

লেখক : নদী-জলবায়ু-পরিবেশ গবেষক ও উপাচার্য,মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত