অন্ধকার সরানোর সহায়ক শক্তি

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

বাংলা গানের প্রখ্যাত গীতিকবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এবং মান্না দে’র গাওয়া শিরোনামের জনপ্রিয় গানটির কল্যাণে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজের নাম-পরিচয় এবং কফি হাউজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়েছিল বাংলাভাষী দুই বাংলার মানুষ। কলকাতার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কফি হাউজের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা জন্মেছিল জনমনে। বাস্তবে আশির দশক পর্যন্ত কফি হাউজ ছিল বাঙালি উঠতি তরুণ লেখক, গবেষক, কবি, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কর্মী থেকে সৃজনশীল কর্মকা-ে নিবেদিতদের প্রাণকেন্দ্র। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার নিশ্চয় তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গানটি রচনা করেছিলেন। অপর দিকে গানটিতে কণ্ঠ দেওয়া বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে অকপটে স্বীকার করেছিলেন, তিনি কখনো কফি হাউজে যাননি। অথচ তার কণ্ঠেই গানটি খ্যাতিলাভ করেছিল। মান্না দে তরুণ বয়সেই বাংলা গানের শিল্পী না হয়ে সর্বভারতীয় প্রচার-প্রতিষ্ঠায় তার কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সঙ্গে বোম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন। বোম্বের হিন্দি ছবিতে গান গেয়েছেন, সুর করেছেন। কিন্তু বোম্বের প্রতিষ্ঠিত হিন্দিভাষী গায়কদের অতিক্রম করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি বলেই অবশেষে ফিরে এসেছিলেন বাংলা গানে। অবিকল মাইকেল মধুসূদনের অনুসরণে।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের সাহিত্য-জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায়ে মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় ঝুঁকে পড়লে ইংরেজরা একজন অ-ইংরেজ নেটিভ ভারতীয় সাহিত্যিককে স্বীকৃতি দেওয়া তো পরের কথা, পাত্তাই দেয়নি। নিরুপায়ে তাকেও ফিরে আসতে হয়েছে মাতৃভাষার কাছে। অগত্যা মধুসূদন দত্ত ইংরেজি সাহিত্য রচনা ত্যাগ করে মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করে অমরত্ব লাভ করেছেন। মান্না দে’র ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার গান পরিত্যাগে হিন্দি গানের সর্বভারতীয় শিল্পী হওয়ার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। মান্না দে পরিণত বয়সে তাই তার আক্ষেপের কথাগুলো গোপন না করে বলেছেন, ‘একমাত্র বাঙালি বলেই আমার হিন্দি উচ্চারণ মোহাম্মদ রফি, মুকেশদের মতো হতে পারেনি।’ শ্লেষে আরও বলেছেন, ‘হিন্দি গানের ভুবনে আই ওয়াজ অ্যান আউট সাইডার।’ প্রত্যেক মানুষের পক্ষে তাৎক্ষণিক ধর্ম পরিবর্তন সহজ-সম্ভব হলেও জাতীয়তার পরিবর্তন অসম্ভব। আশির দশকে কফি হাউজে গিয়েছিলাম, ওই গানের টানেই। কফি হাউজের বেয়ারাদের সবার অভিন্ন পোশাক মাথায় পাগড়ি। ঔপনিবেশিক আমলের খানসামাদের আদলে। পরিপাটি কফি হাউজ, হল্লা নেই তবে গুঞ্জন আছে। টেবিলে টেবিলে বসা আগতরা মাটন কাটলেট, মাখন মাখানো পাউরুটি ইত্যাদির সঙ্গে কফি পান করছে। পরস্পরের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আলোচনায় মগ্ন। এদিক-ওদিক তাকাবারও ফুরসত কারও নেই। সবাই আলাপে-বিতর্কে মশগুল। উঁচু ছাদ। দোতলা পুরোটা এবং তিনতলার প্রায় অর্ধেক এবং দু’পাশে লম্বা বেলকনি নিয়ে কফি হাউজ। উচ্চৈঃস্বরে কথা কেউ বলছে না বটে তবে পরস্পরের সঙ্গে গম্ভীর আলাপ-বিতর্কের চাপা গুঞ্জন শোনা যেত। ব্যস্ত বেয়ারাদের নিঃশব্দ ছোটাছুটি, খাবার পরিবেশন সমস্তটাই ছিল আকর্ষণীয়। অতীতের কফি হাউজের ধারাবাহিকতা আশির দশকের তরুণদের বহন করতে দেখেছি। কিš‘ এখন অশুভ ছায়ায় আবৃত, যা খুব দুখঃজনক।

আমার দেখা সেই কফি হাউজ যে এতটা বদলে যেতে পারে সেটা কল্পনাও করিনি। অতি সম্প্রতি কলকাতা গিয়ে ভ্রমণসঙ্গীদের চাপে কফি হাউজে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, সেটা অনাকাক্সিক্ষত। বদলে গেছে কফি হাউজ একশ’ আশি ডিগ্রিতে। কফি হাউজের কাঠামো নয়। বদলে গেছে কফি হাউজের পরিবেশ। নিচতলার গেইটে ঢুকতেই দেখি নকশালবাড়ী আন্দোলনকারীদের স্মরণে পোস্টার দেয়ালে সাঁটা। এখনো আত্মত্যাগী আন্দোলনকারীদের তারা অনেকে স্মরণে রেখেছে দেখে ভালো লেগেছিল। চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল প্রমুখ নকশালবাড়ী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের স্মরণে পোস্টার এবং পোস্টারের বক্তব্যগুলো পড়ে একধরনের তৃপ্তি পেয়েছি। কফি হাউজের সিঁড়িতে ওঠার ডানপাশে সিগারেটের একমাত্র ছোট্ট দোকানটি ঘিরে তরুণ-তরুণীদের জটলা। পাটের মোটা দড়ির আগুন থেকে সবাই একে-একে সিগারেট জ্বালাচ্ছে। কফি হাউজে ঢোকার আগে নিচে তরুণ-তরুণীদের জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে ওপরে ওঠা দেখে কিছুটা আঁচ করেছিলাম; তবে আমার জন্য যে আরও ভয়ানক চমক ওপরে অপেক্ষা করছে সেটা বুঝতে পারিনি। দোতলায় উঠে কফি হাউজে ঢুকে দেখি কফি হাউজ সিগারেটের ধোঁয়ায় ধোঁয়াচ্ছন্ন। গেইটের ডান পাশে কিছু মাঝ বয়সি নারী-পুরুষ বসে আছে আর বাম পাশের বিশাল অংশে বসে তরুণ-তরুণীরা অবিরাম সিগারেট ফুঁকছে। সেই ধোঁয়ায় কফি হাউজ ধোঁয়াচ্ছন্ন। প্রায় প্রত্যেকের কাছে থাকা মোবাইল ফোন টিপছে, পরস্পর সেলফি তুলছে। খোশগল্প করছে পরস্পর। কফি হাউজ অবাধ ধূমপানের স্বর্গরাজ্যে পরিণত। অথচ কলকাতাসহ সারা ভারতে পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনটির কঠোর প্রয়োগের কারণে ভারতে যত্রতত্র ধূমপান বহু আগেই বন্ধ হয়েছে। অথচ কফি হাউজের চিত্রটি ঠিক বিপরীত। কাউন্টারের দেয়ালে ‘ধূমপান নিষিদ্ধ’ কাগজ সাঁটানো দেখেছি কিš‘ সেটা কেউই তোয়াক্কা করছে না।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃত কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, মেডিকেল কলেজ প্রমুখ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যবর্তী কফি হাউজ। পশ্চিম বাংলার সব প্রকাশনা সংস্থাসমূহ এবং বই বিপণিগুলো কলেজ স্ট্রিট জুড়ে অবস্থিত। কলকাতার মুক্তবুদ্ধি চর্চা, জ্ঞানের চর্চা, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, প্রগতিশীল এবং সৃজনশীল কর্মকা-ের জন্য কফি হাউজ ঐতিহ্যের স্মারক। তার বর্তমান দশা সর্বোপরি তারুণ্যের অবক্ষয় ও অপচয়ের চিত্রটিতে ফুটে উঠেছে কলকাতার বর্তমান সমাজ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের ছবি। যেটি পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়েরই ইঙ্গিত বহন করে। স্বীকার করতে হবে পশ্চিম বাংলার

সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের অনুরূপ আমাদেরও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে, ঘটেছে রুচির দুর্ভিক্ষও। পশ্চিম বাংলা থেকে আমরা দূরবর্তী নই, নিকটবর্তীই বটে। নিজস্ব সংস্কৃতির লালন ও এর বিকাশে শুধু সংস্কৃতি কর্মীই নয়, দেশপ্রেমিক সবারই সমান্তরালে ভূমিকা রাখা উচিত। সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সামাজিক অন্ধকার দূর করে। প্রজন্মের মধ্যে ইতিবাচক বোধের জন্ম দেয়, যার বহুমুখী কল্যাণকর প্রভাব সমাজকে সমৃদ্ধ করে।  

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত