বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলার বিনিময় হারের নামে লুটপাট করছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ডলারের দাম বাড়িয়ে লুটের মালের মতো প্রতি ডলারে ১১৪ থেকে ১১৫ টাকা দাম রাখছে।
গতকাল বুধবার ইআরএফ মিলনায়তনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মো. রেফায়েতুল্লাহ মৃধার সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
জসিম উদ্দিন বলেন, অনেকেই সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির নামিয়ে আনার কথা বলছে, আমি এটা বিশ্বাস করি না; সুদহার বাড়িয়ে রাতারাতি কিছু একটা হয়ে যাবে এমন না। কারণ আমাদের ৮০ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে। অর্থনীতির বড় অংশ ইনফর্মাল। সুদহার বাড়ালে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ হচ্ছে। কিন্তু এনবিআর অ্যানালগই রয়ে গেছে। ভ্যাট আইনের জন্য অনেক টাকা খরচ করা হয়েছে, কোনো কাজ হয়নি। এটা করতে হবে। এনবিআরকে ডিজিটাল হতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ও অ্যানালগ চলতে পারে না। রাজস্বব্যবস্থা ডিজিটাইজেশন করতে হবে। উপজেলা পর্যন্ত করের অফিস খুলতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে অনেক মানুষ আছে যারা কর দিতে পারে। গত ১৪ বছরে গ্রামের অনেক কাজ করেছে সরকার। এখন গ্রামের অর্থনীতি অনেক ভালো।
৪৩ ধরনের সেবা নিতে হলে আয়কর রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক কর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা নিয়ে অনেকে আপত্তি আছে। দেশের ছয় কোটি মানুষের হাতে স্মার্ট ফোন। এ দুই হাজার টাকা কর দেওয়া কঠিন কিছু নয় বলে মনে করেন শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব প্রয়োজন। এজন্য কর নেট বৃদ্ধির প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগের ফলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্র বাড়বে।
এনবিআরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন সমস্যা, অভিযোগসহ নানা বিষয়ে আলোচনার জন্য এফবিসিসিআই ও এনবিআরের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স আছে, কিন্তু তাদের বৈঠক হয় না। তিনি আরও বলেন, পণ্য আমদানিতে এইচ এস কোডের ভুলের জন্য ২০০ শতাংশ জরিমানা করা হয়, তার ২০ শতাংশ পান কর কর্মকর্তা। বাজেটে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, তা কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকলে ভালো হতো।
এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে এনবিআরকেও ডিজিটাল করতে হবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে আয়কর ও ভ্যাট আদায় করতে হবে। উভয় পক্ষের মধ্যে যত কম দেখা হবে, ততই দুর্নীতি কমে আসবে।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকট প্রসঙ্গে মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘১৬ টাকার গ্যাস ২৫ টাকা করার প্রস্তাব আমরাই দিয়েছিলাম। আমাদের শর্ত ছিল, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে হবে। ১৬ টাকার গ্যাসের দাম ৩০ টাকা করা হলো, কিন্তু এখন আমরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে অন্ধকার বেশি ব্যয়বহুল। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাচ্ছি, প্রতি কিলোওয়াটের দাম পড়ছে ২৫ টাকা। অর্থনীতি টেকসই ও সেই সঙ্গে শিল্পোৎপাদন ধরে রাখতে হলে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে।’
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, সরকারের জন্য কঠিন হলেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। খাদ্য ও কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। এগুলো আমাদের জন্য ভালো, এটা আমরা রেখেছি। আগামীতেও অব্যাহত রাখা হবে।
বাজারের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্বীকার করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, পণ্য যে দামে বিক্রি হচ্ছে, উৎপাদন বা কেনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। বারবার উদ্যোগের পরও কাজে আসছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে সব সময়ই ‘ট্রিগারে’ হাত রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ছয় শতাংশ। এটা অর্জন করা কঠিন হবে। তারপরও চেষ্টা করা হবে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার।
সভায় মূল প্রবন্ধে র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আ. রাজ্জাক বলেন, এখন প্রধান সমস্যা মূল্যস্ফীতি। এ সমস্যা স্বীকার করে তা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে।