বেশি সার্ভিস চার্জের কারণে এমএফএসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত

ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সার্ভিস চার্জ আদায়কে বড় বাধা হিসেবে মনে করেন সাধারণ সেবাগ্রহণকারী এবং গবেষকরা। লেনদেনে ঝুঁকি, সাক্ষরতার ঘাটতি, বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততাকে এজন্য দায়ী করেছেন তারা। এ অবস্থায় তারা মোবাইল আর্থিক সেবা বাড়াতে স্মার্টফোনের দাম কমানো, উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার সুপারিশ করেছেন।

‘ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি’বিষয়ক এক পরামর্শক সভায় মাঠ পর্যায়ে এ সংক্রান্ত গবেষণার ফল এবং এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে এ সভার আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। যুক্তরাষ্ট্রের সেবাধর্মী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বিল ও মিলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এতে সহায়তা দিয়েছে। পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা সঞ্চালনা করেন সংস্থার গবেষণা পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ক্যাশ আউট চার্জ বেশি হওয়ায় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক লোকজন বাড়তি চার্জের কারণে এ সেবাগ্রহণে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ করতে পারছে না। বিকাশ অনেক দিন ধরেই লোকসান দিয়েছে। নগদেরও লোকসান হচ্ছে। এ লোকসান কমিয়ে কম দামে সেবা দিতে হলে এজেন্টের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। চারপক্ষের রাজস্ব ভাগাভাগির পর লাভ করতে হয় এমএফএস প্রতিষ্ঠানের। কাজেই ইচ্ছে হলেই ক্যাশ আউটের চার্জ কমানোর সুযোগ খুব একটা নেই। এ সমস্যার সমাধানে একমাত্র বড় সমাধান হবে অ্যাপস ব্যবহার বাড়ানো। এজেন্টের মধ্যস্থতা ছাড়াই এটিএমের মাধ্যমে ক্যাশ আউট করা হলে, অথবা ক্যাশ আউট না করে পণ্য ও সেবা বিক্রির মূল্য বাবদ ডিজিটালি পেমেন্টের পরিমাণ বাড়াতে পারলে গ্রাহকদের ব্যয় কমবে, কোম্পানিও লাভে থাকবে। এ অবস্থায় মোবাইল আর্থিক সেবা বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে নীতিসহায়তার কথা বলেন ড. মনসুর। স্মার্টফোনের দাম কমানো, উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং করের হার কমানোর সুপারিশ করেন তিনি। এ ছাড়া মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ দ্রুতগতির ইন্টারনেট সহজলভ্য করা মানগত উন্নয়নেও সরকারি পদক্ষেপের সুপারিশ করেন তিনি। এ ছাড়া মোবাইল আর্থিক সেবার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি থাকতে হবে। বেসরকারি অপারেটরের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির ওপরও জোর দেন ড. মনসুর।

আলোচনায় পিআরআইর ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহম্মেদ বলেন, উন্নয়ন আলোচ্যসূচিতে ডিএফএস এখন বহুল আলোচিত বিষয়। এ ধরনের সেবার উচ্চ হারের চার্জ বিষয়টি গুরুত্ব নিয়ে সামনে এসেছে। এমএএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাবতে হবে কীভাবে কিছুটা কমমূল্যে মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করা যায়। আস্থার অভাব, জালিয়াতির ভয়ও রয়েছে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে। দুর্বল অবকাঠামোর সংকট তো আছে। নারীবিরোধী পক্ষপাতও এক ধরনের বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এসব বিষয়ে সরকারের শক্তিশালী নীতি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন ড. সাদিক।

সভায় ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস-ডিএফএসের স্থানভিত্তিক পরিস্থিতির ওপর পৃথক তিনটি জরিপের ফল উপস্থাপনা করা হয়। ‘দেশের উত্তরাঞ্চলের সমতলের আদিবাসীদের ডিএফএসে অভিগম্যতা’বিষয়ক সীমিত আকারের জরিপের ফল তুলে ধরেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আশরাফি বিনতে আকরাম। এতে দেখানো হয়, মাত্র ৪২ শতাংশ আদিবাসী এমএফএস গ্রহণ করে থাকে। নগদ অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে (ক্যাশ আউট) উচ্চ হারের সেবা চার্জের কারণে সবার পক্ষে এ সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। জরিপে অংশ নেওয়া এ অঞ্চলের উত্তরাদাতার ৫১ দশমিক ৬১ শতাংশ এ সেবামূল্য কমানোর সুপারিশ করেছেন।

‘হাওরের দরিদ্র মানুষের জীবনে ডিএফএসের প্রভাব’ এ বিষয়ে জরিপের ফল উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। এতে দেখানো হয়, হাওরের ৫২ দশমিক ৩৭ শতাংশ মানুষের ডিএফএস অ্যাকাউন্ট আছে। তারা স্বাধীনভাবে লেনদেন করে। অ্যাকাউন্ট থাকা সত্ত্বেও অন্যের সহযোগিতা নিয়ে লেনদেন করের ৪৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ মানুষ। নগদ গ্রহণে ডিএফএস ব্যবহার করে ৬৮ দশিমক ৩০ শতাংশ মানুষ। টাকা পাঠানোর কাজে ডিএফএস ব্যবহার করের ১৭ শতাংশ। মাত্র ৭ শতাংশ হাওরবাসী সঞ্চয় রাখে এমএফএসের মাধ্যমে।

‘বাংলাদেশের কৃষকদের পক্ষে ডিএফএস অভিযোজন এবং কার্যকারিতা’বিষয়ক জরিপ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আখতারুজ্জামান খান। এতে দেখানো হয়, কৃষিতে ডিএফএসের ব্যবহার কীভাবে বিভিন্নভাবে সুবিধা আনতে পারে। ফলাফলে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া কৃষকদের মধ্যে বিকাশ সেবার একচেটিয়া প্রাধান্য রয়েছে।