ডলার সংকটে বিপন্ন ব্যবসা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে অস্থিরতা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ে রেকর্ড তৈরি হয়। আর এই আমদানি ব্যয় ও করোনাকালের পুরনো দায় পরিশোধ করতে গিয়ে এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়নে নেমে আসে। কিন্তু রিজার্ভের অর্থে পায়রায় প্রকল্প উন্নয়ন, বিমান কেনা, ইডিএফ ঋণ ও শ্রীলঙ্কাকে ধার দেওয়ায় প্রকৃত রিজার্ভ নেমে প্রায় ২৫ বিলিয়নে দাঁড়ায়।

কিন্তু আমদানি ব্যয় যে হারে বাড়ে একই হারে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স না বাড়ায় রিজার্ভ আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। ডলারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই টাকার মান কমে যায়। এতে দেশে আমদানি পণ্যে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন হয়। ফলে মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি পয়েন্ট যোগ করে ডলারের বিনিময় হার।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দুই বছর আগে ২০২১ সালের ৯ জুন ডলার কিনতে খরচ করতে হতো ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। কিন্তু সংকট থাকায় মার্কিন এই মুদ্রা কিনতে এখন খরচ হচ্ছে ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা। দুই বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ২৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে ডলারের মূল্য ধরে রাখায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরও ডলারের বিনিময় হারে সীমা বেধে দেওয়া হচ্ছে।

ডলারের সংকট কাটাতে শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়েছে সরকারকে। তবে ঋণের প্রথম কিস্তি পেলেও দেশে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং শর্তের কারণে স্বাধীনভাবে রিজার্ভের ব্যবহারও করতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নির্দিষ্ট সীমার নিচে রিজার্ভ কমে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় সরকার জরুরি পণ্য আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে। শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় উৎপাদন সংকটের পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে কর্মসংস্থানও কমে গেছে। আবার উৎপাদন কমে যাওয়ায় শিল্পের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই পড়ছে।

এদিকে ডলার সংকটের সুযোগ নিয়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগে আমদানিকারকদের কাছ থেকে বেশি দর নিয়ে নিজেদের অতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করেছে ব্যাংকগুলো। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট মো. জসিম উদ্দিন অভিযোগ করেছেন যে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলার বিনিময় হারের নামে লুটপাট করছে। তিনি বলেছেন, ডলারের দাম বাড়িয়ে লুটের মালের মতো প্রতি ডলারে ১১৪ থেকে ১১৫ টাকা দাম রাখছে ব্যাংক।

২০২২ সালে ডলার কারসাজির অপরাধে ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে এর সঙ্গে আরও আট ব্যাংকের নাম যুক্ত হয়। মার্কিন এই মুদ্রার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু মানি এক্সচেঞ্জ হাউজেও অভিযান চালায়। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর গত বছরের মে মাসে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দর নির্ধারণের বিষয়টি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার পর থেকে ডলারের অভিন্ন দর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (এবিবি) ডলারের দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

সংগঠন দুটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে রেমিট্যান্সে ডলারের দর ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা। আর রপ্তানিতে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১০৭ টাকায়।

আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় আমাদের অধিকাংশ পণ্যই বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব পণ্যের দাম পরিশোধ করতে হয় ডলারের মাধ্যমে। বিপরীতে ডলার আয়ের উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স। এ ছাড়া বিদেশি ঋণও ডলার আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বাণিজ্য ঘাটতি ও রেমিট্যান্স কম আসায় বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এদিকে ডলারের অপর্যাপ্ততায় জ¦ালানি তেল, এলএনজি, শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কঠিন হয়ে পড়ছে। জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারও পড়েছে বেকায়দায়।

গত দেড় বছরে আমদানি দায় পরিশোধে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে রিজার্ভ থেকে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি ডলার বিক্রির কারণে ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে উঠে আসে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দেয়। এ সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন ও প্রাক অর্থায়ন স্কিম ঘোষণা করে। তারপরও তারল্য সংকট কমেনি। উল্টো বেড়েছে। বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমে গেছে।

দেশে ঋণের সুদহার কম থাকায় ব্যবসায়ীরা এখন আর বিদেশি ঋণে আগ্রহী নন। কিন্তু তাদের নেওয়া আগের ঋণ পরিশোধের চাপে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে দেশের আর্থিক হিসাব ২১৬ কোটি ডলার ঋণাত্মক। অথচ, ঠিক এক বছর আগেও এটি ১ হাজার ১৯৫ কোটি ডলার পজেটিভ ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের শেষে দেশের ব্যবসায়ীদের বিদেশ থেকে নেওয়া স্বল্প মেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৪১ কোটি ডলার। কিন্তু এপ্রিলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৮৭ ডলার। অর্থাৎ চার মাসে বিদেশ থেকে কোনো ঋণ না এলেও পরিশোধ করতে হয়েছে ২৫৪ কোটি ডলার।

২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি-বেসরকারি খাতের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬২৪ কোটি ডলার, যার মধ্যে বেসরকারি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ২ হাজার ৪৩১ কোটি ডলার।