ডেঙ্গুর ভয়াবহ চক্রে দেশ

চলতি বছর মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গু ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত পাঁচ মাসে অর্থাৎ প্রাক-মৌসুমেই ভর্তি রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা দেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে একই সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে।

গত বছরের (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও সর্বোচ্চ মৃত্যুর বছর) প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় এবার ৪৭৪ শতাংশ বা ৬ গুণ এবং সর্বোচ্চ আক্রান্তের বছর ২০১৯ সালের প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় ৬০৭ শতাংশ বা ৭ গুণ বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

এ বছর গত পাঁচ মাসে (৩১ মে পর্যন্ত) দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ২২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। গত বছর একই সময়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৫২ জন ও ২০১৯ সালে ২৮৬ জন।

এই পাঁচ মাসে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত চার বছরের মধ্যে (২০১৯-২২ সাল) তিন বছর প্রথম পাঁচ মাসে কোনো মৃত্যু ছিল না। শুধু ২০১৯ সালে দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। এবার প্রথম পাঁচ মাসেই ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এবারও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ডেঙ্গুর হটস্পটে রূপ নিয়েছে। এখন পর্যন্ত এই জেলার রোগীর ৭০ শতাংশই পাওয়া গেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে দফায় দফায় সতর্ক করছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কয়েকবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে। সেজন্য তারা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে আরও সক্রিয় হতে বলেছেন।

এমন পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গুর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। ডেঙ্গুর একটা কঠিন চক্রের মধ্যে ঘুরছি। বাংলাদেশের জন্য এটা একটা কঠিন পরিস্থিতি।’

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ মশা নিধন ও বর্জ্য পরিশোধন। সেটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের না। আমাদের কাজ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা। সিটি করপোরেশনের লোকবল নেই বলে মশার জরিপ আমরা করি। ডেঙ্গুর সাধারণ ও দ্রুত চিকিৎসার গাইডলাইন আপডেট করা হয়েছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকার বড় বড় সরকারি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে ডেঙ্গু চিকিৎসায় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশনকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ দিয়েছে। সে অনুযায়ী, তারাও কাজ করছে।’

ঢাকার বাইরে রোগী বাড়ছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু রোগী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রকোপের শুরুর দিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ছিল শুধু ঢাকা শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে ঢাকার বাইরে সর্বোচ্চ রোগী ছিল ২০১৯ সালে, যা মোট রোগীর ৪৯ শতাংশ। এরপর আর কখনই ঢাকার বাইরে রোগী ১৭ শতাংশ ছাড়ায়নি। অথচ এ বছর প্রথম পাঁচ মাসে রোগীর ৩২ শতাংশই পাওয়া গেছে ঢাকার বাইরে।

২০১৬ সালে দেশে ডেঙ্গু রোগীর ৯৯ শতাংশই ছিল ঢাকায় এবং মাত্র ১ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরে, ২০১৭ সালে ঢাকায় ৯৬ শতাংশ ও ঢাকার বাইরে ৪ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে শতভাগ রোগীই ছিল ঢাকায়। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসে ঢাকার বাইরে সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ রোগী দেখা যায়। এরপর থেকেই ঢাকার বাইরে রোগী বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে ঢাকায় রোগী ছিল ৮৭ শতাংশ ও ঢাকার বাইরে ১৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ঢাকায় রোগী কমে দাঁড়ায় ৮৩ শতাংশে ও ঢাকার বাইরে বেড়ে হয় ১৭ শতাংশ। এ বছর প্রথম পাঁচ মাসেই ঢাকার বাইরে রোগীর সংখ্যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ৩২ শতাংশ হয়েছে।

বেশি রোগী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় থাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর কক্সবাজারে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে এ সংখ্যা ৪২৬ জন। অর্থাৎ এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই সারা দেশের রোগীর অর্ধেকেরও বেশি ৫৩ শতাংশ পাওয়া গেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এ সংখ্যা রোগীর সঙ্গে যোগ করে না সরকার। এমনকি কক্সবাজার জেলার চেয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোগীর আড়াই গুণ বেশি।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। তাদের পরিষ্কার পানির উৎস সীমিত। তারা পানি সংগ্রহ করে অনেক সময় খোলা পাত্রে রেখে দেয়, যা এডিস মশার জন্য একটা ভালো প্রজননক্ষেত্র। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কম জায়গায় মানুষ বেশি। ফলে সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যা পরিস্থিতি, সেখানে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা ‘কঠিন’।

কঠিন চক্রের মধ্যে দেশ : বাংলাদেশ ডেঙ্গু একটা কঠিন চক্রের মধ্যে ঘুরছে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এটা একটা কঠিন পরিস্থিতি। কারণ ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রকৃতি বা ধরন বদলাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের বৃষ্টির মৌসুম যদি পরিবর্তন হয় এবং যদি একটানা বৃষ্টি না হয়ে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়, সেটা আমাদের ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও অবনতশীল করবে।’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমাদের চারপাশে প্রচুর এডিস মশার লার্ভা। সেটা এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এডিস মশার যে চক্র, সেটা একবার যেখানে যায়, সেটা আর দুর্বল হয় না, থেকে যায়। গত বছর থেকে বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় এটা ছড়িয়ে পড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যত বাড়বে, সংক্রমণের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। এখন সারা দেশে ডেঙ্গু হতেই থাকবে।’

মার্চেই সতর্ক করা হয়েছিল : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছিল। সেখানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি জানতে চেয়েছিলেন। তখনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা এবং দেশের কীটতত্ত্ববিদরা সতর্ক করেছিলেন এ বছর পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। ওই সভায় কিছু সুপারিশও করা হয়েছিল। সেসবের কিছু বাস্তবায়নও করছে। উত্তর সিটি করপোরেশন সচেতনতা কর্মসূচি চালাচ্ছে। চিকিৎসক, স্কাউটদের নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু এবার দক্ষিণে রোগী বেশি, যা রোগীর ৬০ শতাংশ। সেখানে তেমন কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। এমনকি যেসব কর্মসূচি দুই সিটিতে চলছে, তা-ও বিজ্ঞানভিত্তিক না। ফলে এডিস মশা মরছে না। ডেঙ্গু প্রকোপও কমছে না।

এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘আমরা দু-তিন বছর আগে থেকেই বলছি ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চলেছে। সারা বছর সব মাসেই ডেঙ্গু থাকবে। কারণ হলো যখন প্রকৃতিতে ডেঙ্গু রোগী ও মশা থেকে যায়, তাহলে জ্যামিতিক হারে ডেঙ্গু রোগী বাড়বে। রোগী ও মশা যত বেশি হবে, রোগী তত বাড়তে থাকবে।’

সরকারের কর্মকৌশল না থাকলে তাদের সতর্ক করেই-বা কী লাভ। তারা তো সর্বোচ্চ ফগিং পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। একটা জাতীয় কর্মকৌশল থাকতে হবে, যা নেই মন্তব্য করেন অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ।

পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ : এশিয়ার বেশ কিছু দেশসহ বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারতের কলকাতাও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ‘আমরা পারছি না। কারণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সারা বছর স্থায়ী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন থাকতে হবে, যা দেশে নেই।’ তিনি আরও বলেন, দেশে সরকারিভাবে ডেঙ্গু রোগীর যে সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে আড়াই গুণ বেশি। প্রকৃত তথ্য পেলে ব্যবস্থাপনাও সঠিক হয়। সমন্বিত মশক নিধন ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ বছরব্যাপী হতে হবে। ৫ বছর বা ১০ বছরের এ রকম একটা মাস্টার প্ল্যানের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ করতে পারলে ধীরে ধীরে ডেঙ্গু কমে আসবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ রকম কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।

অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আট বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা মশার জরিপ অনুযায়ী এডিস মশা নির্মূলে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে ডেঙ্গু বাড়ছে।

আগস্টে সর্বোচ্চ চূড়ার আশঙ্কা : অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গুর মৌসুম গত বছর পুরোই উল্টো হয়েছে। সে বছরের অক্টোবরে ছিল রোগীর ‘টপ পিক’ বা সর্বোচ্চ চূড়া। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনই হয়নি। এর আগে ‘টপ পিক’ হয়েছিল কোনো বছর আগস্ট, কোনো বছর সেপ্টেম্বরে। এ বছর পরিস্থিতি দেখে মনে হয় আগস্টে টপ পিক হয়ে যাবে। অর্থাৎ সে পর্যন্ত রোগী বাড়তে থাকবে।

এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ আছে বলে জানান এই কীটতত্ত্ববিদ। তিনি বলেন, গত বছর ডেঙ্গু মৌসুম দেরিতে শুরু হয়েছে। অক্টোবরে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছিল। নভেম্বরে বেশ ডেঙ্গু ছিল। ডিসেম্বর ও এ বছরের জানুয়ারিতেও রোগী ছিল। অর্থাৎ গত বছরের শেষের দিকে চূড়ায় ওঠা ডেঙ্গুর প্রকোপের ধারাটা থেকে গেছে। সে কারণেই এবার বছরের শুরুতেই ডেঙ্গু প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকার পাশাপাশি বাইরেও রোগী বাড়বে। বিশেষ করে কক্সবাজার এবং বরিশাল বিভাগের দু-একটি জেলায় এবার ডেঙ্গু বাড়বে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।