সাবেক জাসদ নেতা, বর্তমানে জনপ্রিয় কলামিস্ট মাহবু্ব কামাল লিখেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সাথে মৃত্যু হয়েছে সিরাজুল আলম খানেরও। তবে সিরাজুল আলম খানের মৃত্যু শারীরিক নয়, সেদিন আসলে তার রাজনীতির মৃত্যু ঘটেছিল। মাহবুব কামালই ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ১৫ আগস্ট ক্লিনিক্যালি ডেড হলেও সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। আমি তার সাথে অনেকটাই একমত। যে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে জাসদ জন্ম নিয়েছিল, ৭ নভেম্বর সিরাজুল আলম খানের রাজনীতির সাথে মৃত্যু ঘটে জাসদের স্বপ্নেরও। তারপরের ৪৮ বছর এই বাংলাদেশে শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও রাজনীতিতে অপাংক্তেয় ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিলেন সিরাজুল আলম খান, যাকে সবাই ডাকে দাদাভাই নামে। রাজনীতির এই রহস্য পুরুষকে অনেকে কাপালিক নামেও চেনেন। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের এক ঐতিহাসিক চরিত্র সিরাজুল আলম খান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ৮২ বছর বয়সে।
দেশ রূপান্তর সম্পাদক মোস্তফা মামুন ফোন করে জানতে চাইলেন, দাদাভাই সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? আমি বললাম, মিশ্র। বলতে বলতেই ভাবলাম, আসলে সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে মূল্যায়ন কী। ভেবে দেখলাম, আসলেই আমার অনুভূতি মিশ্র। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ সিরাজুল আলম খানকে আমি ভালোবাসি। আবার জাসদ নামে হঠকারী রাজনীতি শুরু করায় তার প্রতি আমার তীব্র অনুযোগও আছে। অনেক ভেবে দেখলাম, আমি তাকে ঘৃণা করি না। আসলে সিরাজুল আলম খান ইতিহাসের এমন এক চরিত্র; যাকে আপনি পছন্দ করতে পারবেন, অপছন্দ করতে পারবেন, ভালোবাসতে পারবেন, ঘৃণা করতে পারবেন; কিন্তু কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারবেন না। সিরাজুল আলম খানকে ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যাবে না। ষাটের দশকেই আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদকে নিয়ে নিউক্লিয়াস গঠন করেছিলেন সিরাজুল আলম খান। এই নিউক্লিয়াসের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক করে তুলতে সিরাজুল আলম খানের বড় ভূমিকা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সৈনিক সিরাজুল আলম খান পাশে থেকে থেকে বঙ্গবন্ধুকে পৌছে দিয়েছিলেন কাঙ্খিত লক্ষ্যে। জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা, জাতীয় স্লোগান- একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এই হোমওয়ার্কগুলো এগিয়ে রেখেছিলেন দাদাভাই। অসম্ভব সাংগঠনিক দক্ষতা, তাত্ত্বিক, মেধাবী সিরাজুল আলম খান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশেষ পছন্দের ছাত্রনেতা, আস্থা আর ভরসার নাম।
বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন তাজউদ্দিন আহমদ। একাত্তরে তিনিই ছিলেন মূলধারা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নিজেরাই নিজেদের কাঁধে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব তুলে নিতে চেয়েছিলেন চার যুবনেতা- সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স-বিএলএফ গড়ার অন্যতম কারিগর সিরাজুল আলম খান। মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি বিএলএফ'এর যোদ্ধারা মুজিব বাহিনী নামে ট্রেনিং নিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন।
কিন্তু এত কাঙ্খিত বিজয় অর্জনের পর বঙ্গবন্ধুর সাথে মতভেদ দেখা দেয় সিরাজুল আলম খানের। যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়তে প্রয়োজন ছিল ঐক্যের, তখনই আসে বিভক্তি। বিজয়ের বছর পেরোনোর আগেই গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। পরের তিন বছর জাসদ মানেই ছিল আতঙ্ক আর হঠকারিতা। পাটের গুদামে আগুন, থানা লুট, এমপি খুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও, ভারতীয় হাইকমিশনারকে অপহরণের চেষ্টা- হেন কোনো হঠকারিতা বাকি নেই যা জাসদ করেনি। ৭ নভেম্বর বিপ্লবের নামে চূড়ান্ত হঠকারিতায় জাসদের রাজনীতির কবর রচিত হয়, আর উত্থান ঘটে বিএনপির। কাগজে-কলমে জাসদের কোনো পদে কখনো ছিলেন না সিরাজুল আলম খান। কিন্তু তিনিই ছিলেন জাসদের মূল কারিগর, স্বপ্নদ্রষ্টা। সিরাজুল আলম খান ছিলেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত। তার ডাকে একটা মেধাবী প্রজন্ম বিপ্লবের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আফিমে বুঁদ হয়ে হারিয়ে গিয়েছিল একটি প্রজন্ম। অনেকে মনে করেন, শেখ ফজলুল হক মনির সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে টিকতে না পেরেই সিরাজুল আলম খান আওয়ামী লীগ ছেড়ে জাসদ গঠন করেছিলেন। আর তাতে দিয়েছিলের বিপ্লবের রোমান্টিক মোড়ক। জাসদের কর্মীদের স্বপ্ন ছিল খাঁটি, কিন্তু সিরাজুল আলম খানের মত তাত্ত্বিক নিশ্চয়ই জানতেন, এভাবে ব্যক্তিগত ক্ষোভ মেটানো যায়, বিপ্লব করা যায় না। বিরোধিতার নামে জাসদ সন্ত্রাস আর হঠকারিতা করেছিল। অনেকে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল জাসদ। তখনকার সরকারও জাসদের ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে দিয়েছিল। জাসদের অনেক নেতাকর্মীকে হত্যাও করা হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যতদিন বেঁচে ছিলেন, সিরাজুল আলম খানের গায়ে ফুলের টোকাও পড়েনি। এমনও শুনেছি, জাসদ প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলেও ব্যক্তি সিরাজুল আলম খানের প্রতি বঙ্গবন্ধুর স্নেহ কমেনি। আর এই স্নেহই দূর থেকে হলেও সিরাজুল আলম খানকে রক্ষা করেছে।
ষাটের দশকে একবার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়া ছাড়া রাজনীতিতে আর কোনো পদ ছিল না সিরাজুল আলম খানের। দুয়েকটি চটি বই ছাড়া নেই কোনো রচনাও, লেখেননি আত্মজীবনীও। তার পদের লোভ ছিল না, অর্থের লোভ ছিল না, সংসারের লোভ ছিল না। ভুল পথে হলেও শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। পথের ভিন্নতা থাকলেও তার স্বপ্নের সারথী আমরাও। ৪৮ বছর ধরে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হলেও ইতিহাসের সাথে একই শহরে থাকার গৌরবের সুতোটাও ছিড়ে গেল। শেরাটনের (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল) লবি বা ধানমন্ডির ২৭ নাম্বারের অক্সফোর্ড স্কুলের আড্ডায় আর সরব হবে না ইতিহাস। বিদায় কমরেড, লাল সালাম।
প্রভাষ আমিন
৯ জুন, ২০২৩