পাঞ্জাব থেকে চট্টগ্রামের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ

চট্টগ্রাম আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন। অপরাধের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের অন্যতম নেতা। ২৩ বছর আগে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের আট নেতাকে হত্যা করে চলে আসেন লাইম লাইটে। জামায়াত ও বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার শেল্টার পেয়ে চলে যান দুবাইয়ে। কয়েক বছর থেকে ফিরে আসেন চট্টগ্রামে। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতাদের হত্যার দায়ে আদালত মৃত্যুদন্ড দিলে আবার পালিয়ে যান ভারতের পাঞ্জাবে। ভারতীয় নাগরিক পরিচয়ে পাঞ্জাবে এক তরুণীকে বিয়ে করে ব্যবসায়িক কর্মকান্ড চালালেও, নিয়ন্ত্রণ করছেন চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ। তার সাঙ্গোপাঙ্গরা নিয়মিত চাঁদা উঠিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন তার কাছে। এমনকি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সাজ্জাদ প্রভাব খাটানোর পাঁয়তারা করছেন। একটি বিশেষ মহলকে সহায়তা করতে সহযোগীদের নির্দেশনাও দিয়েছেন। সম্প্রতি পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের গোপন প্রতিবেদনে সাজ্জাদের বর্তমান কর্মকান্ডের নানা কাহিনি উঠে এসেছে।

এদিকে সাজ্জাদের বিষয়ে তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সাজ্জাদসহ সহযোগীদের আরও তথ্য সংগ্রহ করতে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। তাছাড়া সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের সঙ্গে আলোচনাও করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ১৯৯৯ সালের ২ জুন স্থানীয় কাউন্সিলর লিয়াকত ও ২০০০ সালের ১২ জুলাই শহরের বহদ্দারহাটে ব্রাশফায়ার করে ছাত্রলীগের আট নেতাকে হত্যা করে আলোচনায় আসেন সাজ্জাদ। তার রাজনৈতিক গুরু বিএনপি নেতা ও যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান। তাদের আশ্রয়-প্রশয়ে থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষে চলে আসেন তিনি। ফাইভস্টার জসিম, মামুন তার ডান হাত হিসেবে পরিচিত। সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে বেশি সক্রিয় মামুন। তাছাড়া ফিরোজ, মুন্না, সরওয়ার ওরফে বাবলা, নূরনবী ওরফে ম্যাক্সন ও মঈনুদ্দিন রাশেদ ওরফে ভাগিনা রাশেদ তার অন্যতম ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত। ইতিমধ্যে বাবলা ও ফিরোজ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। ছাত্রলীগ নেতাদের হত্যা মামলা ছাড়াও অস্ত্র মামলায় ২১ বছরের কারাদ-প্রাপ্ত নূরনবী ওরফে ম্যাক্সন পালিয়ে যান কলকাতায়। বছর তিনেক আগে কলকাতায় আশ্রয়দাতা এক নারীর হাতে মারা যান ম্যাক্সন। অভিযোগ আছে, ওই নারীর সঙ্গে সাজ্জাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন (সিএমপি) পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাজ্জাদ দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন। তার সাঙ্গোপাঙ্গরা তৎপর থাকলে আমরা সতর্ক আছি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তারা জামিনে বের হয়েছে, সেই তথ্য পেয়েছি। তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট সাজ্জাদকে নিয়ে গোপন প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনটি পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামে আট ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হত্যায় নিম্ন আদালতে ফাঁসির দন্ড পাওয়া সাজ্জাদ ২০০৪ সালে দুবাই পালিয়ে যান। সাজ্জাদকে ধরতে ইন্টারপোলে ‘রেড নোটিস’ এখনো ঝুলছে। সাজ্জাদের সাম্রাজ্য পাহারা দিতে শিল্প এলাকাখ্যাত বায়েজিদ, বিবিরহাটে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে তিনটি কিশোর গ্যাং প্রতিষ্ঠা করেছেন তার সেকেন্ড ইন কমান্ড আবদুুল্লাহ আল মামুন। এসব কিশোরের কাছেই তুলে দেওয়া হয়েছে সাজ্জাদের অস্ত্রভান্ডার। কিছুদিন আগে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অস্ত্রসহ ধরা পড়ে। তাদের স্বীকারোক্তিতে ফাঁস হয় সাজ্জাদ ও মামুনের নানা অপকর্ম। গত বছর চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকায় একটি তোশক কারখানায় আগুন দেওয়ার পর আলোচনায় আসে বিদেশে থাকা সাজ্জাদের চাঁদাবাজির কাহিনি। দেশে তার সহযোগীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-বাড়িতে গিয়ে চাঁদা দাবি করছে। দাবিকৃত টাকা না পেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা বাসাবাড়িতে। আর বিদেশে বসে পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছেন সাজ্জাদ। দেশে পুরো প্রক্রিয়া দেখভাল করার দায়িত্ব তার কাঁধে। কেউ সমস্যায় পড়লে তিনি যোগাযোগ করেন চট্টগ্রামে কয়েকজন ‘বড় ভাইয়ের’ সঙ্গে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০২ সালের ১৯ মে সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মামুন পাসপোর্টে নিজের নাম, পিতার নাম পরিবর্তন করে একটি পাসপোর্ট তৈরি করেন। ওই পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৭ সালের ১৮ মে। বাবার নাম মোহাম্মদ ইউনুচ হলেও পাসপোর্টে লেখা হয়েছে মোহাম্মদ আলী। হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণ মাদার্শার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনে একটি অংশে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে ভারতে আটক হয়েছিলেন সাজ্জাদ। তবে ভারতের কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর সাজ্জাদের ‘চাঁদাবাজির উৎপাত’ আরও বেড়ে যায়। সাজ্জাদের সহযোগীরা চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে বায়েজিদ থানার ওয়াজেদিয়া, চালিতাতলী, হাজীরপুল, চান্দগাঁও এলাকার শমসেরপাড়া, পাঁচলাইশ থানার বিবিরহাট এলাকায়। এলাকায় বাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে জমি ক্রয়-বিক্রয়, জমি ভরাট, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, শিল্পকারখানা থেকে ভাসমান দোকান ও পরিবহন স্ট্যান্ডকেন্দ্রিক বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে সক্রিয় আছে সাজ্জাদ। এমনকি সাজ্জাদের সঙ্গে চট্টগ্রামের কয়েকজন কিছু আওয়ামী লীগ নেতা।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ ভয়ংকর প্রকৃতির। তিনি পাঞ্জাব থেকে নিয়মিত বাংলাদেশে চাঁদা ওঠাচ্ছেন। তার সাঙ্গোপাঙ্গরা মাঝেমধ্যে দেখা করতে পাঞ্জাব যান। বিশেষ করে মামুন তার অন্যতম সহযোগী। আমাদের যে প্রতিবেদনটি এসেছে, তা সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সাজ্জাদের অন্তত ৭০ জন সদস্য সক্রিয় আছে। চাঁদার টাকায় তিনি পাঞ্জাবে আরাম-আয়েশে আছেন। ভারতীয় নাগরিক পরিচয় দিয়ে বিয়েও করেছেন। তার স্ত্রীর নাম জাকৌজে। সাজ্জাদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তাছাড়া ভারতের সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সাজ্জাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বেলাল উদ্দিন মুন্না ও আবদুল্লাহ আল মামুন। তার বিয়ের খরচ হয়েছে চাঁদার টাকায়। মামুনই মূলত সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, জমিদখল, ফরমায়েশি খুনের সমন্বয় করছেন। চাঁদা আদায়ের আগে সাজ্জাদ ফোনে কথা বলে বিভিন্ন কায়দায় হুমকি দিচ্ছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।