খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ কাল সোমবার। প্রার্থীদের প্রচারণা শেষ হয়েছে। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও জয় নিশ্চিত করার হিসাব-নিকাশ করছেন প্রার্থীরা। এবার বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের বিজয়ী হওয়ার প্রত্যাশা অনেকটা বেড়ে গেছে। তবে ভোটের মাঠে না থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতের ভোটাররা নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী করতে বড় ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও বিএনপি দলীয়ভাবে নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেছে। তবে মাঠে কিছু নেতাকর্মীকে দেখা যাচ্ছে। এ কারণে বিএনপি-জামায়াত যদি এককভাবে কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে যেকোনো মুহূর্তে ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে বলছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
এদিকে আজীবন বহিষ্কার, শোকজ ও বহিষ্কারের হুমকির মধ্যেও বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশকে কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে অনেকটা প্রকাশ্যেই কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। নগরীর খালিশপুর ও দৌলতপুর থানা এলাকার ওয়ার্ডগুলোতে বিএনপি নেতাদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক লিয়াকত হোসেন লাভলু, ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম মামুন, যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ আরমান, মহানগর বিএনপির সদস্য রুবায়েত হোসেন বাবু অনেকটা প্রকাশ্যেই ওই এলাকার কাউন্সিলর প্রার্থী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গোলাম রব্বানী টিপুর পক্ষে কাজ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বহিষ্কৃত হয়েও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচন করছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সাজ্জাদ আহসান তোতন। ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আলীর পক্ষে থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আল আমিন লিটন, নগর যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক এস এম জসিম, ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম আহমেদ মিলু ও খবির উদ্দিন কাজ করছেন। একই ওয়ার্ডে আরেক কাউন্সিলর প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা ফিরোজ আলমের পক্ষে প্রকাশ্যে নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন মহানগর জাসাসের আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম বাচ্চু। ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মির্জা তরফদারের পক্ষে সক্রিয় রয়েছেন ওয়ার্ড বিএনপির দুই যুগ্ম আহ্বায়ক। ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য জাকির হোসেন, সাবেক সমবায়বিষয়ক সম্পাদক শহীদ শেখ বাবু, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজু কাজ করছেন সদ্য যুবলীগে যোগ দেওয়া কাউন্সিলর প্রার্থী সুলতান মাহমুদ পিন্টুর পক্ষে। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাউন্সিলর প্রার্থী ফয়েজুল ইসলাম টিটোর নির্বাচনী সভায় দেখা গেছে ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিনকে।
তবে অভিযুক্তরা বিষয়টি অস্বীকার করছেন। তারা বলছেন, একই এলাকা হওয়ায় প্রার্থীদের সঙ্গে সৌজন্যের জন্য কথা বলি। আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব না।
জানা গেছে, প্রায় অর্ধেক সরকারবিরোধী ভোটার থাকলেও তাদের ভোটে কেন্দ্রে উপস্থিতির প্রবণতা অনেক কম। কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বিএনপির নেতাকর্মীকে প্রচারণায় অংশ নিতে দেখো গেছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
খুলনা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব শফিকুল আলম তুহিন বলেন, প্রার্থী হওয়ায় ৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার ও দলের নিষেধ অমান্য করে নির্বাচনে ভূমিকা রাখায় ১১ জনকে শোকজ করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে আমাদের মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এটা অনেক কমে এসেছে।
গতকাল শনিরাব রাত পর্যন্ত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা বিরামহীন প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। নির্বাচনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ১১ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে বিজিবি সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে।
ফলাফল বিশ্লেষণে জানা যায়, কেসিসির গত পাঁচটি নির্বাচনের তিনটিতেই জয়ী হয় বিএনপি। দুটিতে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের দলীয় প্রতীকে মেয়র পদে প্রার্থী পাঁচজন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে প্রায় ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন।
এবারের সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক (নৌকা), জাতীয় পার্টির শফিকুল ইসলাম মধু (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল আউয়াল (হাতপাখা), জাকের পার্টির সাব্বির হোসেন (গোলাপ ফুল) ও একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম শফিকুল ইসলাম মুশফিক (দেয়াল ঘড়ি) মেয়র পদে লড়ছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা বিভাগ ও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, বিএনপি বর্জন করায় কেসিসি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়ার চিন্তা করার সুযোগ নেই। কেসিসিতে এবার উৎসবমুখর নির্বাচন নেই। মাঠে কোনো উত্তাপ নেই। কে মেয়র হবেন তা ভোটের আগেই নগরবাসী হিসাব করে রেখেছেন।
কেসিসির রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন জানান, ১২ জুন খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছ। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের নিরাপত্তায় ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়ন করা হয়েছে।
মধু ও আউয়ালের নিজস্ব পাঁচ থেকে ছয় হাজার ভোট রয়েছে। তবে বিএনপি-জামায়াত ঘেঁষা সাধারণ ভোটাররা কাউন্সিলর প্রার্থী ও আওয়ামী নেতাদের চাপে ভোট দিতে যেতে পারেন। আর সুষ্ঠুভাবে ভোট প্রয়োগ করতে পারলে মধু, আউয়াল ও মুশফিক ভালো ভোট পেতে পারেন। আউয়াল সাধারণ নারী ভোটারদের ভোট বেশি পেতে পারেন। সে হিসেবে মুশফিক পাবেন যুবক ও তরুণদের কিছু ভোট। তবে বিএনপি-জামায়াত যদি এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তালুকদারের সঙ্গে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার প্রচুর চাপ দেখা যাচ্ছে। মানুষদের কড়াকড়িতে রেখেছে। চেক করা হচ্ছে। সর্বশেষ সেনাপ্রধানের যে ওয়ার্ডে নির্বাচন করছেন সেই ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শেখ হাফিজুর রহমান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
উল্লেখ্য, এবারের কেসিসি নির্বাচনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩৩ ও নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৬। ১৩ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুজন কাউন্সিলর প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। ২৯টি ওয়ার্ডে শুধু কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৭৫ জন। ১২ জুন দ্বিতীয় ধাপে খুলনা সিটি করপোরেশনে ভোট হবে। ভোট হবে ইভিএমে।