বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক সংকটকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাজেটে যে অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে তা মোটেও কোনো সংকটকে নির্দেশ করে না। সরকার প্রকারান্তে সংকটকে স্বীকার করছে না বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। পাশাপাশি আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সড়ক ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
গতকাল রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৩-২৪ ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান।
সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বর্তমানে দেশের সংকটগুলো চলমান, তার অন্যতম প্রধান কারণ সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার অভাব। সরকারের এখন প্রয়োজন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া। এখন মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি, সরকার এটাকে বলছে বৈশ্বিক কারণে হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি বৈশি^ক কারণে হচ্ছে?
বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার মনে করে তিনি বলেন, আমাদের যদি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকত, তাহলে মূল্যস্ফীতি এত বেশি হতো না। আর কয়লার অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেত না। আর মানুষকেও কষ্টে ভুগতে হতো না।
তিনি বলেন, সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করেছে। এটা কীভাবে সম্ভব? আমি মনে করি সরকারকে বাস্তবসম্মত বাজেট ও তার বাস্তবায়ন করা উচিত।’ এ সময় তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার আহ্বান জানান।
এ সময় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে দেশ একটি সংকটময় মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাজেটে তা উল্লেখ করা হয়নি। বাজেটে এ সংকটকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে আদৌ কি তা সম্ভব! বিনিময় হারকে ১০৪ টাকায় ধরে রাখার কথা বলা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে বাজেটে অর্থমন্ত্রী সংকটকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। কিন্তু সরকার যদি সংকটকে মাথায় রেখে বাজেট করত তাহলে সরকারেরই ভালো হতো।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের মধ্যে হয়তো এ রকম একটা ভাবনা রয়েছে যে সংকট চলে যাবে। বলা হচ্ছে, ১৫ দিন পর বিদ্যুৎ খাতের সংকট চলে যাবে। কোন যুক্তিতে চলে যাবে? পায়রার জন্য যে ৩৭ হাজার টন কয়লা আনছি তা সাড়ে তিন দিনের মধ্যে শেষ হবে। রামপালের জন্য কয়লা আনা হয়েছে, তা শেষ হবে আড়াই দিনের মধ্যে। তিনি আরও বলেন, সরকারকে সংকট সমাধানের সহজ পন্থা থেকে বের হয়ে এসে সংকটের গভীরে গিয়ে কাজ করতে হবে।
এ সময় এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতি একটি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সরকারকে তা নিয়ে কাজ করতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানিপণ্যে শুল্কছাড় দিতে হবে। আমাদের রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। সরকার গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাট পাকা করেছে, তবুও কেন বাজেটে সড়ক ও যোগাযোগ খাতে বেশি বরাদ্দ রাখতে হবে। এখন প্রয়োজন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো। সেটি পেলে আমাদের উৎপাদন বাড়বে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।’ এ সময় তিনি সরকারকে দক্ষতা বাড়ানোর জন্যও নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘অনেকে বলছে, সরকার আইএমএফের শর্তে বাজেট করেছে, আসলে বিষয়টি তা নয়। আইএমএফ আমাদের কোনো চাপ দেয়নি। তারা আমাদের পরামর্শ দিয়েছে, আমরা তাদের পরামর্শ সে অনুযায়ী নিয়েছি। তবে আমাদের কিছু সংস্কার করা দরকার, তার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো অন্যতম। তিনি আরও বলেন, বাজেটের আলোচনা জানুয়ারি মাস থেকে হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আর এসব আলোচনায় অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের থাকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। কারণ তারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করে, তাদেরও অভিজ্ঞতার দরকার আছে।’
সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি কভিড-পরবর্তী সময়ে অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেকটা কমেছে। তা শুধু আমাদের দেশেই নয় পৃথিবীর অনেক দেশে হয়েছে। তবে সরকার তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। আশা করছি, সামনের দিকে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে।’