মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে দেশের সীমিত আয়ের মানুষ। এই চাপ সামাল দিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। আর এটি বাস্তবায়নে বাজারে টাকার সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য রিজার্ভ মানি কমিয়ে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মুদ্রানীতিতে (জানুয়ারি-জুলাই) ১৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে আনতে এমন পরিকল্পনা করছে।
সূত্র জানায়, মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে এবারের মুদ্রানীতিতে অনেক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সুদের হারের সীমা তুলে ইন্টারেস্ট রেট করিডর এ বেঞ্চমার্ক পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বেসরকারি ঋণের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হবে।
আসন্ন মুদ্রানীতিতে সরকারের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। একইভাবে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। মুদ্রানীতিতে এগুলোর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ ধরে লক্ষ্য অর্জনের মাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এছাড়া রিজার্ভের প্রকৃত হিসাবায়ন, অর্থাৎ রিজার্ভ থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণবাবদ অর্থ বাদ দেওয়া হবে আসন্ন মুদ্রানীতিতে।
গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, ডলার ও টাকার সংকট। এসবই এখন অর্থনীতির প্রধান সমস্যা। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে টাকার সংকট মেটাবে। এতে ডলার সংকট আরও বাড়বে। আগে বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভর করে মুদ্রানীতি করা হতো। নানা ভুল নীতির কারণে এখন বিদেশি মুদ্রা দেশে আসা কমে গেছে। এখন টাকা ছাপিয়ে সরবরাহ করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, যা পুরো অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে। তবে এবার যদি কম টাকা ছাপানো হয় তবে মূল্যস্ফীতি একেবারে কমবে না। তবে এটা মন্দের জন্য ভালো বলা যেতে পারে। ঋণের সুদহারের সীমা পুরোপুরি তুলে দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা একটা ভালো দিক।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, রেপো সুদহারের গড়ের সঙ্গে একটা হার যোগ করে তিন মাস পর পর সুদের হার নির্ধারণ করা হবে। এটা বাজারভিত্তিক হবে। বাজারের ঠিক করবে সুদের হার বাড়বে নাকি কমবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দেওয়া (রেপো) ও টাকা তুলে নেওয়ার (রিভার্স রেপো) সুদহারও বাজারভিত্তিক করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় রেপোর সুদহার কলমানি সুদের সঙ্গে ওঠানামা করবে। উল্লেখ্য, এক ব্যাংক আরেক ব্যাংকের কাছ থেকে যে সুদে টাকা ধার নেয়, সেটাই কলমানি সুদ। কলমানি সুদের হার বাজারভিত্তিক হলেও তা ৭ শতাংশের ওপরে উঠতে দেয় না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সম্প্রতি তা প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি ঠেকেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) সময়ের জন্য আগামী ১৮ জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকঋণের সুদের হার, বাজারে টাকার সরবরাহ, ডলার সংকট এসব মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া বিদেশি মুদ্রার মজুদ, প্রবাসী আয়, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি বিষয়ে মুদ্রানীতিতে পদক্ষেপ নিতে নানা সুপারিশ রয়েছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বাংলাদেশ যে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ পাচ্ছে, তার শর্তের মধ্যে সুদহার ও ডলারের দাম বাজারভিত্তিকসহ নানা শর্ত রয়েছে। জুলাই থেকে সব ক্ষেত্রে ডলারের একটি দর চালু করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।