জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসক) এর সম্মেলনে অংশ নেওয়ার ভুয়া তথ্য দিয়ে ভিসা নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা যান সুমনা আফরোজ নামের এক কথিত মানবাধীকার কর্মী। হিউম্যান রাইটস অরগানাইজেশনের কর্মী পরিচয়ে ইকোসকে অংশ নিতে প্রথমে জাতিসংঘে আবেদন করেন তিনি। সেখান থেকে অফার লেটার নিয়ে বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদন করেন। দূতাবাস ভিসা দিলে সুমনা আমেরিকা গিয়ে আর দেশে ফিরে আসেন নাই। বিষয়টি নজরে আসলে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে আমেরিকান দুতাবাস।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({}); (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});সম্প্রতি বেশ কিছু ভিসার আবেদনপত্র নিয়ে সন্দেহ হলে সেগুলো যাচাই বাছাই করে ভুয়া পায় বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাস। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানায় পৃথক পাঁচটি মামলা করা হয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে। দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী সম্প্রতি এমন ভুয়া কাগজে আমেরিকা গেছেন অনেকে।
এমন ঘটনার প্রেক্ষিতে আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটে এক বিজ্ঞপ্তিতে ভিসা আবেদনকারীদেরকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মিথ্যা তথ্য ও নথি উপস্থাপনের কারণে তার ভিসা শুধু প্রত্যাখ্যানই নয়, ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের জন্য অযোগ্য ঘোষিত হবে।
আমেরিকান দূতাবাসের করা মামলাগুলো তদন্ত করছে ডিএমপি’র গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। জানতে চাইলে ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ গতকাল তার নিজ কার্যালয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাল কাগজে ভিসার আবেদন করার ঘটনায় সম্প্রতি আমেরিকান দূতাবাস থেকে গুলশান থানায় পৃথক পাঁচটি মামলা করা হয়েছে। ওইসব মামলায় এ বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত সর্বমোট মোট ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও বেশ কিছু আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, আমেরিকান দূতাবাসের দেওয়া তথ্য মতে সুমনা আফরোজ নামের এক নারী জাল কাগজ দিয়ে ইকোসকে অংশ নেওয়ার কথা বলে আমেরিকা গিয়ে আর দেশে ফেরেনি। তাকে হিউম্যান রাইটস অরগানাইজেশন নামের যে মানবাধিকার সংস্থার কর্মী পরিচয়ে আমেরিকা পাঠানো হয়েছে সেটি নাম সর্বস্ব। এমন আরও কিছু এনজিও আছে যাদের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে।
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভিসার এসব আবেদন পত্রের সঙ্গে কখনো জাল কাগজ, পাসপোর্টে অন্যান্য দেশের ভিসার ভুয়া সিল আবার কখনো জাতিসংঘকে বোকা বানিয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের অফার লেটার বাগিয়ে নিয়ে আমেরিকান দূতাবাসে ভিসার আবেদন করা হচ্ছে। এসব ভিসা প্রত্যাশীরা বিভিন্ন চক্রের সঙ্গে ১২ থেকে ২০ লাখ টাকার চুক্তি করছে। চক্রগুলোই ভিসার আবেদনের জন্য জাল কাগজ বানিয়ে দূতাবাসে জমা দিচ্ছে। এই ভিসা বাণিজ্য চালিয়ে নিতে চক্রের কেউ গড়ে তুলেছেন নাম সর্বস্ব এনজিও কেউ আবার সরবরাহের প্রতিষ্ঠান। এমন ছলচাতুরির মাধ্যমে অনেকে বাগিয়ে নিয়েছেন আমেরিকার ভিসা। যারা আমেরিকায় অবস্থান করছেন।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});জানা গেছে, ভিসা প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আমেরিকান দূতাবাস থেকে গুলশান থানায় প্রথম মামলা করা হয় চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি। এ মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. জুনায়েদ আলম সরকার জানান, গ্রেপ্তার পলাশ চন্দ্র দাস অবৈধভাবে আমেরিকান ভিসা পাওয়ার জন্য ট্রাভেলার্স ডায়েরি এজেন্সির মালিক ওয়াহিদ উদ্দিন ও তার সহকারী শফিকুল ইসলাম সুমনের সঙ্গে যোগসাজসে মালদ্বীপ, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের জাল সিল যুক্ত ভিসা পাসপোর্টে ব্যবহার করে। এছাড়া মাহাবুবুর রহমান খান ভিসা পেতে হ্যাপি হলিডেস এজেন্সির মালিক আরিফুর রহমান ও তার সহকারী মো. আবু জাফরের সঙ্গে যোগসাজসে বিভিন্ন দেশের জাল ভিসা ও সিল নিজেরা তৈরি করে পাসপোর্টে ব্যবহার করে।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});গত ৮ ফেব্রিুয়ারি করা আরেক মামলার অনুসন্ধানে নেমে ডিবি জানতে পারে, মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জামের ভুয়া ক্রয় আদেশ দেখিয়ে মার্কিন কোম্পানিতে ভুয়া ই-মেইল করে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে আমেরিকার ভিসা নিচ্ছে এক চক্র। চক্রের হোতা মো. রেজাউল ইসলাম (৬০) ২০১১ থেকে ১২ সাল পর্যন্ত নিজ কোম্পানি ডিফেন্স আইকন এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে লোকাল টেন্ডারের মাধ্যমে চাল-ডাল সরবরাহ করত। এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০১৪-১৫ সাল থেকে জনপ্রতি ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া তথ্যে আমেরিকার ভিসা পাইয়ে দেওয়ার প্রতারণা করে আসছে। ডিজিডিপি পদ্ধতি সম্পর্কে সে বিশেষভাবে পারদর্শী। বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামি কোম্পানির সঙ্গে পূর্বে এ ধরনের বহু প্রতারণা করেছে রেজাউল।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});এ চক্রটি প্রথমে আমেরিকান সিগনাল কোঅপরারেশনের কাছে নিজেদেরকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন মালামাল সাপ্লায়ের পরিচয় দেয়। সারা এন্টারপ্রাইজ পরিচয়ে তারা ১.২ মিলিয়ন ডলারের ভুয়া ক্রয় চুক্তি দেখিয়ে মার্কিন কোম্পানিকে ই-মেইল করে। রেজাউল করিম নিজেকে সারা এন্টারপ্রাইজের মালিক সবুজ আলম পরিচয়ে আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের নামিদামী কোম্পানির কাছে বাংলাদেশ আর্মিতে মালামাল সরবরাহের জন্য ক্রয় চুক্তি করে থাকে। কিন্তু ওই চক্রের মূল উদ্দেশ্য থাকে অবৈধ পন্থায় উপায়ে লোকদের বিদেশ পাঠানো। এ চক্রের ৭ সদস্যকে রামপুরা থানা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া গত ২১ মে গুলশান থানায় করা আরেক মামলায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের কথা বলে জাতিসংঘ সদরদপ্তর এ ভুয়া তথ্য যুক্ত ইমেইল পাঠিয়ে আমেরিকার ভিসা সংগ্রহকারী চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে, মহিউদ্দিন জুয়েল ও উজ্জল হোসাইন ওরফে মুরাদ একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার এবং প্রতারক চক্রের মূল হোতা। তারা নাম সর্বস্ব একটি সংস্থা ‘প্রটেকশন ফর লিগাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন’ এর আড়ালে টাকার বিনিময়ে ২০১৯ সাল থেকে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে আমেরিকায় মানব পাচার করে আসছে।
ডিবির তদন্তে উঠে এসছে, নাম সর্বস্ব আরও একটি এনজিও 'কথক একাডেমি' এর আড়ালে আবুল কাশেম শেখ নামের এক প্রতারক ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে ২০১২ সাল থেকে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে আমেরিকা, জার্মান, জাপান, ইতালি, দুবাই, ফ্রান্স সহ অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতে মানব পাচার করে আসছে।