চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে মেধা-দক্ষতা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি হয়ে ওঠা শেখ হাসিনা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নিষ্ঠুরতার বিচারে অসামান্য দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। দেশের উন্নয়নযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। আর মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন নানা ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে ৭৭ বছরে পা রাখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশের নানা গণমাধ্যম ও সুধী মহলে অনন্য হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন।
গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশে যে তাক লাগানো উন্নয়ন করেছে, তা বিদেশি সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানদেরও দৃষ্টি কেড়েছে। বাংলাদেশ যে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল, এ কথা একাধিক রাষ্ট্রপ্রধান অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন। প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু তৈরি করে বিশ্বে এ বার্তা দিতে পেরেছেন যে, বাংলাদেশ পারে। তার হাত ধরে বাংলাদেশে এখন মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বপ্নও এখন বাস্তব। শেখ হাসিনা সরকারের এমন সাফল্য বিশ্বনেতাদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে তিনি বেশ সমাদৃত নিজ কর্মগুণে।
২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দূরত্ব ছিল যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। নির্বাচন ঠেকাতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জ¦ালাও-পোড়াও, মানুষ খুন সব ধরনের আন্দোলন করে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি। এর মধ্যেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি হলো পুত্রবিয়োগে শোকাতুর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে তার গুলশানের বাসভবনে গিয়েছিলেন তিনি। খালেদা জিয়ার বাসায় ঢুকতে না দিয়ে বরং অমানবিক আচরণ দেখিয়েছেন বিএনপি নেতারা। সে ঘটনার খবর দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ফলাও করে ছাপা হয়েছে। মানুষের কাছে থেকে সমর্থন পেয়েছেন শেখ হাসিনা। শুধু ঢুকতে না দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি বিএনপি নেতারা, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখার বিরল ঘটনা সবার আবেগকে নাড়া দিয়েছে।
আরেকটি ঘটনা হলো তখনকার ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ রাজনীতি পরিহার করে নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় বিএনপিকে। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আচমকা ফোন করে গণভবনে আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন খালেদা জিয়া।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে বাংলাদেশে। মিয়ানমারের সঙ্গে লাগোয়া দেশের সীমান্ত খুলে দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বে মানবিক নেতা হিসেবে খ্যাতি পান, যা তাকে বিশ্ববাসীর কাছে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশ্বনেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবিক নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। জনাধিক্যের চাপে পিষ্ট হলেও, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢোকার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো দিন। ওইদিন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে সেনাবাহিনীর একটি দল। তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। সে ঘটনায় জড়িতদের দায়মুক্তি দিয়েছিল পরবর্তী সরকার। ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা স্বজনদের এ নৃশংস হত্যাকা-ের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেন। শাস্তি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন খুনির। মৃত্যুদ-ে দ-িত আরও কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী কয়েকটি দেশে রয়েছে। তাদের ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকরের উদ্যোগ নিলেও এখনো সফল হয়নি আওয়ামী লীগ সরকার।
এ ছাড়া একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতা বিরোধিতাকারী মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনেছে শেখ হাসিনার সরকার। দেশ-বিদেশে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও জামায়াত-বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে, তাদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রীও রয়েছেন।
রাজনীতির দীর্ঘ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন। তবু কখনো পিছপা হননি। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সবচেয়ে নৃশংস হামলার শিকার হন রাজধানীতে দলের কার্যালয়ের সামনে। এরশাদের সময় চট্টগ্রামে লালদীঘি ময়দানে সমাবেশে যাওয়ার পথে শহরে হামলার কবলে পড়ে তার গাড়িবহর। এত কিছুর পরও পরাক্রম দেখিয়েছেন সব ক্ষেত্রে। অকপটে সাহসী উচ্চারণ করেছেন নিজের সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে, শক্ত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন কোনো রাখঢাক না রেখেই। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতার কড়া সমালোচনা করেছেন। সব মিলিয়ে রাজনীতিতে অজেয় এক চরিত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।