বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামাল দেওয়া, দুর্বল রাজস্বনীতি ও দুর্বল মুদ্রানীতি এ তিন সংকটের মধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। এ বাজেট বাস্তবায়ন দুরূহ। বাজেটে চলমান অর্থনৈতিক চাপের কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘বাজেট পরবর্তী আলোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক ও মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।
মূল প্রবন্ধে ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে অর্থনীতি যে চাপের মুখে আছে সেটি সরকার স্বীকার করে নিয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যেটি লক্ষ্যমাত্রা থাকা ৫ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের অবনতি হবে বাকি সময়ে। জোরেশোরে আমদানি নিয়ন্ত্রণের চাপ দেওয়া হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের, অথচ আগের অর্থবছরের একই সময় এটি ছিল ৬৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা সুদের হার বাড়াতে পারতাম, সে সুযোগও হারালাম। যে বছর মূল্যস্ফীতি বেশি হয়, সে বছর যদি প্রবৃদ্ধি বেশি চাই, তাহলে সেটি সাংঘর্ষিক। এ পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্যমাত্রা। বিশে^র বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে, আমাদের দেশে প্রায় ১০ শতাংশ। মুদ্রানীতির কোনো পদক্ষেপই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজে আসছে না।
ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, এবারের বাজেটে মোটা দাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চ্যালেঞ্জ তিনটি হলো প্রথমত, রাজস্বনীতি। সরকার যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতি। তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনটি পরামর্শ দেওয়া হয় সরকারকে। বাজেটে ঘাটতি কমাতে হবে। তার জন্য সরকারি খরচ কমাতে হবে। পাশাপাশি সরকারের নেওয়া বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) কমাতে হবে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আনার যে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার তা বাস্তবায়ন করতে হলে ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়াতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো রাখতে হলে ডলারের মূল্য বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
সংগঠনটি জানায়, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ২৮ শতাংশ হওয়া দুরূহ। পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যারা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ২৮ শতাংশ করতে পারে। প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের যে লক্ষ্যমাত্রাগুলো দেওয়া হয়েছে তা অবাস্তব। আমাদের দেশ থেকে টাকা বের করে নেওয়ার প্রবণতা আছে। ফরমাল চ্যানেলেই টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। যার কারণে এ বছর রেমিট্যান্সও অল্প বাড়বে। এত লোক বিদেশ যায় রেমিট্যান্স কেন বাড়ছে না? এটি সন্দেহজনক।
ড. রাজ্জাক বলেন, সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদজনিত ব্যয় ধরেছে মোট বাজেটের ১২ ভাগ, এটি ১৫ ভাগ হলেও অবাক হব না। ব্যাংক খাত থেকে বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এরকম ঋণ নিলে সামষ্টিক অর্থনীতি বিপাকে পড়বে। ৫ দশকে যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, গত এক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সেই পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা বৈদেশিক ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছি। বিদেশি দেনার সুদের হার বেড়েছে। এ বছর ৮০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হবে। আরও কিছুদিন পর এক ট্রিলিয়ন টাকা লাগবে শুধু সুদ পরিশোধে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অনেক দিন ধরেই সরকার সতর্কবাণী উপক্ষো করে আসছে। রাজস্বনীতি নিয়ে যে সতর্কবাণী সেটি আজকের দেওয়া না। ৮ থেকে ১০ বছর এ সতর্কবাণী দিয়েই যাচ্ছি আমরা। সরকার এ বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আজ সরকারের সক্ষমতা কমে আসার মূলে ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত না করা। এটি যদি এখন চিহ্নিত করা হয়, আইএমএফ বলছে, এক বছর লাগবে প্রস্তুতি নিতে। তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে বাস্তবায়ন করতে। আমাদের দেশে ছয় থেকে সাত বছরও লাগতে পারে।
তার মতে, সামনে নির্বাচন। বাজেট বাস্তবায়নে আরেকটি অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। এখন এক্ষেত্রে সরকারের পলিসি প্যারালাইসিস দেখা দিয়েছে। তারা দোটানায় আছে, আমরা কি নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখব নাকি তারপর ছেড়ে দেব। ততদিনে কী অবস্থা হবে সেটি কেউ বলতে পারে না। সেটি যে ভালোর দিকে যাবে না সেটি অনুমেয়।