উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতায় বিদ্যুৎ সংকট

প্রথমে পায়রা, এরপর রামপাল, এরপর, তারপর? জ্বালানির অভাবে পুরোমাত্রার উৎপাদন সম্ভব হবে না বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। কারণ এ সংকট সাইকেল সহসাই কাটছে না। বিশেষ করে, কয়লা ও তেলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বেশির ভাগ সময় বন্ধই রাখতে হবে সরকারকে। এটি সংকটের বাস্তব চিত্র। বিশ্ববাজারে কয়লার দাম কম থাকলেও ডলার সংকটে এলসি খোলা যাচ্ছে না। একই সমস্যা ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও। গত এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৭ হাজার মেগাওয়াট থেকে তিনগুণের বেশি বাড়িয়ে প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট করা সরকারের সফলতা। কিন্তু সেটিই এখন সরকারকে ফেলেছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ বর্তমান সংকটের ক্ষেত্রে দায় রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের অপরিকল্পিত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট। নবায়নযোগ জ্বালানি এবং ক্যাপটিভ যোগ করলে সেটি ২৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালে এটিকে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা করে রেখেছে সরকার। (তথ্য : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩)বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বহুমুখী জজ্বালানির ব্যবহার ইতিবাচক হলেও অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরল জ্বালানি (ফার্নেস অয়েল/ডিজেল) ব্যবহার হয় ২৮ দশমিক ১১ শতাংশ, দেশীয়, আইওসি ও এলএনজি (ব্লেন্ড গ্যাস) ৫০ দশমিক ৩২ শতাংশ, দেশীয় ও আমদানি (সিংহভাগ) কয়লা ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, বিদ্যুৎ আমদানি হয় ১০ দশমিক ০২ শতাংশ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি হচ্ছে ০১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। (তথ্য : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩) সরকারের তথ্য পর্যালোচনা করেই বলা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির জোগান অনেকটাই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে পিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয়ের প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য প্রায় ১১ টাকা ৫০ পয়সা। যদিও পিডিবি এ বিদ্যুৎ লোকসান দিয়ে বিতরণ কোম্পানির কাছে বিক্রি করছে ৮ টাকা ১০ পয়সায়। এই লোকসানের কারণ আমদানি জ্বালানি দিয়ে উৎপাদন ও ক্যাপাসিটি চার্জ। পেট্রোবাংলার কাছে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো (আইওসি) প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা পাবে। অন্যদিকে, প্রায় ২৬ মিলিয়ন ডলার বা ৩০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে বিপিসির। সরকারি এই তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে স্বচ্ছতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ে নির্দেশনা দিয়েছে সরকারকে। 

বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বার্ষিক আমদানি ব্যয় পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার। জ্বালানি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান করতে এখন হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। এ নিয়ে চিঠি চালাচালি ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যেও। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে আমার করা প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলছিলেন, ‘আমরা দুমাস আগে থেকেই জ্বালানি সংকটের বিষয়টি জানতাম। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক বিষয়, এলসি খোলার বিষয়, সময়মতো জ্বালানি পাওয়াসহ সমন্বয়ের বিষয়টি দেখতে হয়। কোনো একটি বিষয় বাধাগ্রস্ত হলে আল্টিমেটলি বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়। উৎপাদন কেন্দ্র থাকলেও কিছু করার থাকে না।’ তার এমন বক্তব্য বিশ্লেষণে এটা অনুধাবন করা যায় যে, সংকট আপাত নয়, দীর্ঘমেয়াদি।

এবার নজর দেওয়া যাক খাতওয়ারি বিদ্যুৎ উৎপাদন চিত্রের দিকে। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, বর্তমানে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ৪২ দশমিক ২৬ শতাংশ, যার বেশির ভাগই তেলভিত্তিক। অন্যদিকে সরকারি খাতে উৎপাদন হয় ৩৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আঞ্চলিক সহযোগিতায় আমদানি করা হয় ১০ দশমিক ০২ শতাংশ আর যৌথ উদ্যোগ রয়েছে ৭ দশমিক  ৮৩ শতাংশ। এই তথ্য বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ বেসরকারি খাতের হাতে রয়েছে। বর্তমানে পিডিবির কাছে বেসরকারি খাতের পাওনা বকেয়া পড়ছে বিশ হাজার কোটি টাকার ওপরে। ফলে এসব উদ্যোক্তারা কোনো কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখলে বিপাকে পড়তে হবে সরকারকে। পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জ ও উচ্চমূল্য পরিশোধের বিষয়টিও থাকছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে গত এক যুগে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। যেটি নিয়ে বিস্তর সমলোচনা হয়েছে। আমদানি করা বিদ্যুতে আদানির চার মাসে বিল পরিশোধ করতে হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। আবার পায়রাকে বিল দিলেও কয়লা বাবদ পিডিবির কাছে বকেয়ার পরিমাণ ৩০০ মিলিয়ন ডলার। রামপালের বকেয়াও কম নয়। সরকারি প্ল্যান্টে বকেয়া আছে প্রায় ৫২৬ মিলিয়ন ডলার।

সরকারের পরিকল্পনার আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম পরিশোধ। গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকার অঙ্কে বিক্রি ও বিল সংগ্রহ করে সরকার। কিন্তু উৎপাদক পর্যায়ে জ্বালানির অর্থ পরিশোধ করতে হয় ডলারে। ফলে এখানেও বড় একটা লোকসানের মুখে পড়ে পিডিবি। এ ছাড়া পিডিবি বিদ্যুৎ বিক্রিতে যে লোকসান দেয়, সেটি ভর্তুকি হিসেবে পরিশোধ করার কথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের টানাপড়েন এবং সময়মতো অর্থ ছাড় না করার বিষয়টি জটিলতা সৃষ্টি করে। সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি নিকট ভবিষ্যতে যুক্ত হবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ। ফলে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় একটি হযবরল অবস্থা তৈরি হবে।

সরকারের উৎপাদন পরিকল্পনায় দেশে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ও নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোর জ্বালানি আমদানিনির্ভর। অর্থাৎ এসব কেন্দ্রের জন্য বিপুল অঙ্কের জ্বালানি আমদানি করতে হবে। কিন্তু পরিকল্পনায় জ্বালানি জোগানে উৎসের বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোন দেশ থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করা হবে, খরচ কী হবে, বিশ্ববাজার পরিস্থিতি কী হবে সেসব ব্যাপারে নিশ্চিত নয় সরকার নিজেই। আবার গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ক্ষমতা অনেক হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন কোনো পরিকল্পনা নেয়নি সরকার। যদিও ক্ষমতার শেষভাগে এসে ৪৬টি কূপ খনন পরিকল্পনা ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি-পিএসসি সংশোধন করেছে সরকার। সার্বিক অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের নিজস্ব জ্বালানি নির্ভরতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। আবার আমদানির যতটা দরকার হবে, সেটির জন্য বরাদ্দ ও বিনিয়োগের বিষয়টিও নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতে সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় না হলে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সরকারের পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে দশ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হলেও তথ্য বলছে, মাত্র এক দশমিক ৬৯ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে। এর মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বছরের বেশির ভাগ সময়েই নানা কারণে বন্ধ থাকে। অর্থ অপচয় আর অনিয়মে ব্যর্থ হয়েছে বাসা-বাড়ির ছাদে বাধ্যতামূলক সোলার বসানোর প্রকল্পটিও। সরকারের জন্য আরেকটি সমস্যা হয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ হওয়ায় মানুষের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার আকাক্সক্ষা আকাশচুম্বী। সে জন্যই মানুষ বলছে, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকে না, তাহলে কয়লার বিল কেন বকেয়া থাকবে? তাই সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আস্থায় আনতে হবে সরকারকেই।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, বাংলাভিশন

www.rishannasrullah.me
rishan.journalist@gmail.com