ত্রিশক্তির অঙ্কে নির্বাচনী রাজনীতি

সরাসরি সমর্থন চীনের কৌশল

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি এবং দেশটির সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কর্মকান্ড আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। দেশটির এমন তৎপরতার বিপরীতে অবস্থান জানিয়েছে চীন। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি চীন সমর্থন জানিয়েছে। গত বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে এ সমর্থনের কথা জানান।

সরকারপ্রধান এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি চীনের এ প্রকাশ্য অবস্থান কূটনৈতিক ও কৌশলগত বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এটা অনেক দিন ধরেই বোঝা যাচ্ছিল চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত প্রত্যেকেই বাংলাদেশকে নিজেদের বলয়ে চায়। ভূরাজনৈতিকভাবে বিশ্ব মোড়লদের কাছে বাংলাদেশ যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মন্দা ও ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা এ তিন কারণের বাইরেও বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে।

তারা বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সবসময়ই ভারতের সঙ্গে একটি সুসম্পর্ক বজায় রাখে। আবার বড় দেশ হিসেবে ভারতের জন্য বাংলাদেশকে নানা বিষয়ে চাপে থাকতে হতে পারে। এর সঙ্গে ভারত যুক্তরাষ্ট্র সুসম্পর্কের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রেরও এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে প্রয়োজন। যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের এবং ভারতের সীমান্ত রয়েছে। আবার চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সুসম্পর্ক রয়েছে, যা ভারতের জন্য অনেকটাই হুমকি। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের চরম বিরোধ। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র শত টানাপড়েনের পরও ভারতের সঙ্গেই মিত্রতা বজায় রাখতে চায়। সেই সঙ্গে নিজেদের বলয়ে রাখতে চায় বাংলাদেশকে। গত দেড় দশক ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাড়ছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সে বিষয়টিও পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে পাশে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন ঘিরে চাপ তৈরি করে আসছে গত তিনটি নির্বাচন থেকে। এবার এটি আরও বেশি প্রকাশ্য হয়েছে।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের ওপর যখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ছে তখন ভারতের ভূমিকাও দেখার জন্য দেশের রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছ। ভারত মধ্যস্থতার ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যকার দূরত্ব নিরসন করতে পারে এমন সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে হঠাৎ প্রকাশ্যে অবস্থান জানিয়েছে চীন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এ মাসের ২১ থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের কথা রয়েছে। আর এ সফরে বাংলাদেশ ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে উঠতে পারে এবং ইতিবাচক সমাধান হতে পারে, এমন গুঞ্জন রয়েছে। ফলে ওই সফরের আগেই চীন এ সমর্থন দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিল।

তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরেই চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নানাভাবে বাড়াচ্ছে। অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির এ দেশটি আন্তর্জাতিকভাবেও নিজেদের প্রভাব তৈরির চেষ্টা করছে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো চীনসহ কয়েকটি দেশেরও আগ্রহ আছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে আগ্রহ আরও জোরালো হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত চার দেশীয় কোয়াডেও বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি চায় দেশটি। অন্যদিকে চীনসহ পাঁচ দেশ নিয়ে গঠিত ব্রিকসের সদস্য হতে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি- সেভেনের বিকল্প জোট হিসেবে পরিচিত ব্রিকেসে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকা-ের কারণেও বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের এ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হতে চায় বড় দেশগুলোও।

তিনি বলেন, ‘চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারত যারাই তাদের প্রকাশ্য অবস্থান নিক না কেন, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির পথ ধরেই হাঁটছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ঘোষণা রয়েছে, তেমনি চীন ও ভারতের সঙ্গেও রয়েছে। আমাদের সবাইকেই লাগবে। কাজেই চীন প্রকাশ্যে অবস্থান জানালে বাংলাদেশ চীনের পক্ষে চলে যাবে, এরকম ধারণার কারণ নেই। তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি নিয়েও দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে, সেটিও ধারণা করার কারণ নেই।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি নতুন মেরূকরণ। চীন প্রকাশ্যে না এলেও তারা গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং এ অঞ্চলে গঠিত জোটে তারা বাংলাদেশকে পাশে চায়, এটাও বোঝা যায়। তবে নির্বাচন নিয়ে প্রভাবশালী দেশগুলোর যে হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, সেটি আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ের সংকট। নিজেরা সমাধান করতে না পারার কারণেই গত কয়েকটি নির্বাচনের আগে থেকেই আমরা দেখছি বিদেশিরা নানা মতামত বা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।’

চীনের ওই বক্তব্য গণমাধ্যমে আসার পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকার মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, এটাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র।’

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য সম্পর্কে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য সরকারের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলতে চায়, যেকোনো আত্মমর্যাদাশীল দেশের মতো বাংলাদেশও নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবে, সার্বভৌমত্বের চেতনার ভিত্তিতে সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।