দিনের খেলা শেষ হওয়ার পর ফোনে যোগাযোগ হলো হাসিবুল হোসেন শান্তর সঙ্গে। আফগান বোলারদের শরীর আর মনের অবস্থাটা কেমন সেটা বুঝিয়ে বলার জন্য বাংলাদেশের সাবেক এই পেসারকেই মনে হলো সবচেয়ে উপযুক্ত! কারণ ভাষাগত অসুবিধার কারণে রোজ রোজ আফগানিস্তানের পক্ষে আসছেন কোচ জোনাথন ট্রট। তার কাছ থেকে আফগানিস্তান দলের চেয়ে অ্যাশেজ নিয়ে জানতে চাওয়া আগ্রহী সাংবাদিকই বেশি!
৪ উইকেটে ৪২৫ রান তোলার পর অবশেষে দান ছেড়েছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে জয়ের জন্য আফগানদের সামনে ৬৬২ রানের হিমালয় সমান লক্ষ্য। টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিতীয় ইনিংসে সর্বোচ্চ ৪১৮ রান তাড়া করে জেতার নজির আছে, ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যেটা করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আফগান দলে কোনো ব্রায়ান লারা বা শিবনারায়ণ চন্দরপলরা নেই যারা এমন অসম্ভবকে সম্ভব করার সামর্থ্য রাখেন। তবুও বাংলাদেশ যে প্রতিপক্ষকে নিজেদের সর্বোচ্চ রান চাপায় পিষ্ট করল, সেটা হাতে অঢেল সময় থাকাতেই। সেই সঙ্গে আগামী মাস পাঁচেকে কোনো টেস্ট না থাকাও একটা কারণ হতে পারে।
আগের দিনের দুই হাফসেঞ্চুরিয়ান নাজমুল হোসেন শান্ত ও জাকির হাসান সকালে আফগান বোলারদের চড়াও হতে দেননি। দ্বিতীয় দিনের গোড়াতেই যে আচমকা ধস, তেমন কিছু হয়নি শুক্রবারে। বরং দুজন সাবলীলভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন ব্যক্তিগত শতরানের দিকে। ছন্দপতন জাকিরের রান আউটে আত্মাহুতিতে। শান্ত স্টিয়ার করে স্লিপ আর গালির ফাঁক দিয়ে বল পাঠিয়েছিলেন বাউন্ডারির দিকে, বলের পেছনে ছুটছিলেন নাসির জামাল। শান্ত দুই রান নেওয়ার পর জাকির ডাকলেন তৃতীয় রানের জন্য, দৌড়ালেন। ওদিক থেকে থ্রো করেছেন ইব্রাহিম জাদরান। জাকির এসে পৌঁছানোর আগেই আফসার জাজাই ভেঙে দিলেন স্টাম্প। জাকিরের রান তখন ৭১, বাড়তি একটা রানের জন্য ওভাবে না দৌড়ালে হয়তো ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় শতরানের দেখাটা পেয়েই যেতেন।
মুশফিকুর রহিম যেন এসেছিলেন টি-টোয়েন্টি খেলতে! প্রথম বলে দুই রান, পরের বলে ছক্কা আর তার বলেই রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে ক্যাচ! ৩ বলে ৮ রানের ক্ষণস্থায়ী ইনিংস খেলে বিদায় নিয়ে মাঠে আসার সুযোগ করে দিলেন মমিনুল হককে।
মাঠে তখন দুই প্রান্তে শান্ত আর মমিনুল। শান্ত শতরানের দোরগোড়ায়। আগের ইনিংসে করেছিলেন শতরান, দ্বিতীয় ইনিংসেও শতরান করলে দুই ইনিংসেই শতরান করা মমিনুলের অনন্য রেকর্ডটায় ভাগ বসাবেন এই তরুণ। ২২ গজ দূর থেকেই নিজের অনন্য রেকর্ডে শান্তকে ভাগ বসাতে দেখলেন মমিনুল। তখনই হয়তো ঠিক করে ফেলেছেন, এবার শতরান করতে হবে তাকেও।
হাশমতউল্লাহর বল স্কয়ার লেগে ঠেলে ১ রান নিয়ে শান্ত হয়ে গেলেন একই টেস্টের দুই ইনিংসে শতরান করা দ্বিতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার। শান্তর দ্বিতীয় ইনিংস থামে ১২৪ রানে, প্যাডের ওপর নিরীহ দর্শন বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিডউইকেটে ক্যাচ। এই আউটে যতটা না কৃতিত্ব বোলারের, তার চেয়ে বেশি সূর্যের। গনগনে রোদে দুটো দিন মিলিয়ে ২৬১ মিনিট ব্যাটিং করেছেন। যে রোদে মিনিট দশেক হাঁটলেই ঘেমে গোসল করতে হয়, সেখানে প্যাড-গ্লাভস-হেলমেট চাপিয়ে প্রায় দেড়দিন ব্যাট করেছেন শান্ত। ক্লান্তির কাছে হার মেনে শান্ত বিদায় নিলেও হাল ছাড়েননি মমিনুল। তাকে আউটই করা যায়নি। যেন পণ করেই এসেছিলেন, দীর্ঘদিন পর টেস্টে ব্যাটিং করার শেষ সুযোগটা যতটা সম্ভব কাজে লাগাবেন।
শুরুতে খানিকটা জড়তা ছিল মমিনুলের। নিজের খেলা চতুর্থ বলেই তার বিপক্ষে এলবিডাব্লিউর জোরালো আবেদন ছিল, রিভিউও নিয়েছিল আফগানিস্তান। তারপর বেঁচে যান মমিনুল। নিজেই বলেছেন, যত বেশি সময় ক্রিজে কাটাতে পারেন ততই তার খেলার ধার বাড়তে থাকে। নিজাত মাসুদকে ৪ মেরে ৬৭ বলে হাফসেঞ্চুরি মমিনুলের, চা-বিরতির আগে ৯৫ রানে অপরাজিত। বিরতির পর ইয়ামিন আহমদজাইয়ের বাউন্সারে র্যাম্প শট খেলে উইকেটের পেছন দিয়ে চার মেরে ১০০ রানে পৌঁছে যান মমিনুল। টেস্ট ক্যারিয়ারের ১২তম শতরান, বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ শতরান তারই। ইদানিং মুশফিক পেছন থেকে এসে তাকে প্রায় ধরে ফেলছেন, ব্যবধানটা একটু বাড়িয়ে নিলেন মমিনুল। ২৬ ইনিংস পর শতরানের দেখা পেয়েছেন মমিনুল, এর মধ্যে মুশফিক করেছেন ৩টি শতরান।
মমিনুলের শতরানের পর বাংলাদেশ ইনিংস ঘোষণা করবে, এমনটাই ভেবেছিলেন জোনাথন ট্রট। তার প্রত্যাশাকে ভুল প্রমাণ করে আরও কিছুক্ষণ ব্যাট করল বাংলাদেশ। মমিনুল যখন ১২১ রানে অপরাজিত, ৬৬ রানে পৌঁছে গেছেন লিটন দাসও তখনই ড্রেসিংরুম থেকে ভেসে এলো সেই ইঙ্গিত। ৪ উইকেটে ৪২৫ রানে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা বাংলাদেশের, লিড ৬৬১ রানের।
দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে প্রথম বলেই উইকেট হারায় আফগানিস্তান, ইব্রাহিম জাদরানকে লেগ বিফোর উইকেটের ফাঁদে ফেলেন শরিফুল ইসলাম। লম্বা স্লিপ কর্ডন সাজিয়ে পেসারদের দিয়ে বল করাচ্ছিলেন লিটন দাস, ফল পরের ওভারেই তাসকিন আহমেদের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন আব্দুল মালিক। ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে তাসকিনের বাউন্সারে কুঁকড়ে গিয়েছিলেন হাশমতউল্লাহ শাহিদি, বল লাগে মাথায়। খানিকটা সময় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকার পর মাঠ ছাড়েন আফগান অধিনায়ক। কনকাশন প্রোটোকল অনুযায়ী তার শুশ্রুষা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোচ ট্রট।
বিকেল ৫টা বাজার খানিক বাদেই আলোর স্বল্পতায় খেলা থামিয়ে দেন আম্পায়াররা। তৃতীয় দিনের খেলা শেষে আফগানদের সংগ্রহ ১১ ওভারে ২ উইকেটে ৪৫ রান। খেলার বাকি আছে ২ দিন, আফগানদের জয়ের জন্য চাই ৬১৭ রান।
ফিরে যাই হাসিবুল হোসেনের কথায়। অনূর্ধ্ব ১৭ দলের ট্রায়ালের ফাঁকে ফাঁকে টেস্টের খোঁজখবর রাখা সাবেক এই পেসার বলছিলেন, লম্বা সময় বোলিং করার ক্লান্তির কথা। ড্রেসিংরুমে ফিরে খানিকটা জিরিয়ে নিতে না নিতেই আবার নেমে যেতে হতো বোলিংয়ে। এই গরমে আফগান বোলারদের কষ্টের কথা বলতে বলতে ফিরে গেলেন বাংলাদেশের টেস্টের শৈশবে। সারা দিন বল করে উইকেটের জন্য মাথাকুটে মরা আর প্রতিপক্ষকে রানের পাহাড় গড়তে দেখার সেই অভিজ্ঞতার উল্টোচিত্রই তিনি দেখেছেন কাল। প্রায় সারা দিন ব্যাট করছে বাংলাদেশ আর ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে প্রতিপক্ষের। আফগান কোচ বলেছেন, টেস্ট ক্রিকেট কতটা কঠিন সেটা বুঝতে পেরেছে আফগান ক্রিকেটাররা। যে শিক্ষাটা বছর কুড়ি আগে নিয়মিতই পেতে হতো বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের।