ঢাকায় বিএনপির কমিটি

চূড়ান্ত করতে না পারায় অসন্তোষ হাইকমান্ডের

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি গঠন হয়েছে প্রায় দুই বছর হতে চলল। ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তাদের আওতাধীন সব ওয়ার্ড ও থানা কমিটির পুনর্গঠন কাজ শেষ করেছেন। তবে পিছিয়ে আছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তারা ওয়ার্ড কমিটির কাজ শেষ করলেও থানা কমিটিগুলোর কাজ শেষ করতে পারেননি। দুই ইউনিটের কমিটি গঠনের কাজ যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় হতাশ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ অবস্থায় তিনি আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রামে ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করতে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিভাগীয় সমাবেশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দক্ষিণের কমিটি গঠনের কাজ ধীরগতিতে চলছে। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণের কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকায় কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এ কারণে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে তারুণ্যের সমাবেশ করার জন্য। ১৪ জুন চট্টগ্রামে প্রথম সমাবেশ হবে। সর্বশেষ সমাবেশ হবে রাজধানী ঢাকায়। কোরবানি ঈদের পর শুরু হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে চূড়ান্ত সমাবেশ। এর মধ্যে আর কমিটি গঠনের কাজ শেষ করা যাবে না।’

কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় প্রতিনিয়ত কর্মসূচি থাকছে। এর মধ্যে আবার দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু কয়েক দফা জেল খেটেছে। এখনো জেলে রয়েছে। এ কারণে দক্ষিণের ওয়ার্ডের কমিটি গঠনের কাজ শেষে হয়েছে। থানার কমিটি গঠনের কাজ গুছিয়ে এনেছি। সদস্য সচিব কারাগার থেকে বেরিয়ে এলে থানা কমিটি ঘোষণা করা যাবে।’

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ২৫টি থানা এবং ৫৮টি ওয়ার্ড শাখা রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণে ২৪টি থানা এবং ৭৫টি ওয়ার্ড শাখা রয়েছে। নতুন কমিটি ঘোষণার পর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দুই ইউনিটের কমিটি গঠনে আটটি করে সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। এরপর সর্বপ্রথম ওয়ার্ড কমিটিগুলো ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওয়ার্ড কমিটিগুলোর নেতাদের ভোটে পরবর্তী সময়ে থানা কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরের কমিটি গঠনের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু যেভাবে শেষ হয়েছে তাতে কিছু কিছু জায়গায় ঝামেলা রয়ে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তরের বিভিন্ন আসনে যারা নির্বাচন করেন এবং আগামীতে যারা নির্বাচন করতে চান, তাদের মধ্যে কমিটি ভাগাভাগির কারণে সমস্যা রয়েই গেছে। যেকোনো সময়ে দ্বন্দ্ব চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ধানমন্ডির আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রবিউল ইসলাম রবি ও বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীমের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। মিরপুরের পল্লবীতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক ও যুবদল কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। গত রমজানে এক ইফতার অনুষ্ঠানে দুই গ্রুপের মধ্যে রেষারেষির মধ্যে পড়ে সাংবাদিকরা আহত হন।’

উত্তরের কমিটি গঠনে যে সমস্যা রয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি একটি বড় দল। এখানে নেতাদের সংখ্যা বেশি। নেতাদের মধ্যে নেতৃত্বের লড়াই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এটা কোনো বিষয় নয়। তবে দক্ষিণ বিএনপি পুনর্গঠন কাজ শেষ করতে না পারলেও আমার পেরেছি। আমাদের সাংগঠনিক ওয়ার্ডের সংখ্যা ৭১টি। ওয়ার্ডের কমিটি গঠনের পর উত্তরের আওতাধীন ২৬টি থানার পুনর্গঠন কাজও শেষ হয়েছে।’

আন্দোলন-সংগ্রাম ও দলের প্রয়োজনে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে না পারায় কমিটি গঠনের পাঁচ বছর পর ভেঙে দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি। ৩ আগস্ট ২০২১, বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমানকে ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক ও আরেক উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালামকে দক্ষিণের আহ্বায়ক করে নতুন আঙ্গিকে নতুনদের নিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা মহানগরের এ দুই কমিটি অনুমোদন করেছেন।

২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর বিএনপিকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে ভাগ করে এমএ কাইয়ুমকে সভাপতি ও আহসানউল্লাহ হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে উত্তরের এবং হাবিব উন নবী খান সোহেলকে সভাপতি ও কাজী আবুল বাশারকে সাধারণ সম্পাদক করে দক্ষিণের কমিটি গঠন করেছিল বিএনপি। দুই বছরমেয়াদি সেই কমিটি পাঁচ বছর অতিক্রম করলেও মহানগর কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, ২০১৮ সালে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দির সময় এ কমিটি কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০২০ সালে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মহানগর কমিটি প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। সেই সিটি নির্বাচনে কেন্দ্রে এজেন্ট পর্যন্ত দিতে পারেনি মহানগর কমিটি।