সিপিডির বাজেট সংলাপ

লক্ষ্যমাত্রাগুলো উচ্চাভিলাষী বাস্তবায়নে সন্দেহ

সরকার যে বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে তাতে লক্ষ্যমাত্রাগুলো উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ। আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও যে লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে রাখা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হয়নি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে ১৩ ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

গতকাল রবিবার ‘বাজেট সংলাপ- ২০২৩’-এ এসব কথা তুলে ধরা হয়েছে। রাজধানীর গুলশানের লেক শোর হোটেলে সিপিডির এই বাজেট সংলাপ হয়। সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে অধিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ সংকট কাটানোর কোনো উদ্যোগের কথা বলা নেই বাজেটে। উন্নয়ন ক্ষেত্রে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের অবস্থা বেশি ভালো নয়। বাজেটে বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়নি। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বর্তমান সংকটময় সময়ে চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না গেলে আগামীতে অর্থনীতিতে সমস্যার সৃষ্টি হবে। বাস্তবতা বিবেচনা করেই সবকিছু চিন্তা করা উচিত। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির ব্যাপক চাপ রয়েছে। সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সরকার ব্যাংক থেকে ধার করছে, এতে ব্যক্তি ঋণ কমে যাবে। বিনিয়োগ রক্ষণশীল রেখে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপ সহ্য করা কঠিন হবে।’

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যপূরণ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে আস্থার সংকট রয়েছে। এটি ব্যাংকিং এবং শেয়ারবাজার উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গত ৫০ বছরে যেভাবে বাড়েনি, গত এক বছরে তার চেয়ে বেশি বেড়েছে। আগামী অর্থবছরে টাকা ছাপিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের ঋণ জোগান দেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটি ঠিক হবে না। তবে রিজার্ভ সংকট কাটাতে পাইপলাইনে জমে থাকা ঋণের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বাড়ানো যেতে পারে।’

অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুতের অবস্থা খুবই খারাপ। ঢাকা শহরে কিছুটা অবস্থা ভালো হলেও গ্রামের অবস্থা খুবই খারাপ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাজেটে এ সমস্যা সমাধানে খুব বেশি জোর দেওয়া হয়নি। বড় বাজেট দিয়ে বেপরোয়া কর আরোপ করা হচ্ছে। এতে সরকার খুশি হলেও আমরা আতঙ্কিত।’

ডিসিসিআই সভাপতি ব্যারিস্টার সামির সাত্তার বলেন, ‘রক্ষণশীল বিনিয়োগের বছর চলছে। এই সময়ে শ্রমিকের মজুরির চাহিদা পূরণের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করলে মুদ্রাস্ফীতির বাজারে কিছুটা সাহায্য করবে বলে মনে করি।’

সংলাপে অতিথি ছিলেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, শ্রমিক নেত্রী ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামির সাত্তারসহ অনেকে।

প্রতি বছরের মতো এবারও বাজেট ডায়লগের আয়োজন করেছে দেশের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। এই ডায়লগে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ। আলোচনার একপর্যায়ে দুজনের বাহাসে জমে ওঠে।

সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু। পাল্টা জবাব দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। অনুষ্ঠানে আমীর খসরু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘অনির্বাচিত’ বলার পর তা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী মান্নান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আমীর খসরু বলেন, ‘বাজেট কে দিচ্ছে কারা দিচ্ছে? এরা কি জনগণের কাছে জবাবদিহির কোনো সরকার? তারা কি কোনো নির্বাচিত সরকার? তারা যদি ইলেক্টেড না হয়ে থাকে, তাহলে জবাবদিহির তো কোনো প্রয়োজন নাই। দ্যাট ইজ দ্য ফান্ডামেন্টাল কোয়েশ্চন।’

এরপর প্রধান অতিথির বক্তব্যের সময় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতার কথার সূত্র ধরে ক্ষোভে ফেটে পড়েন মান্নান। তিনি বলেন, ‘আপনারা বলে বেড়াচ্ছেন, দেশে সুশাসন নেই। আমরা কোথায় কুশাসন করেছি, তার প্রমাণ দেন। জনগণের আদলতে যান, আইনের আশ্রয় নেন। খেলাধুলা করতে চাইলে গ্যালারিতে নয় মাঠে নামুন। ডাকুন তো কালকে হরতাল, ডাকুন তো। দেখি ১০০ জন লোক নামাতে পারেন নাকি?’

সেমিনারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নন-প্রফিট এনজিওগুলোকে কোম্পানি আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শহরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর দিতে পারলেও কীভাবে একটি গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করপোরেট কর দেবে? এটা কেমন শিক্ষাবন্ধব বাজেট হলো?

জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে এত পরিমাণ অর্থ লুট হয়েছে ও পাচার হয়েছে। কিন্তু কয়জন লোক শাস্তি পেয়েছে। দেশে আইনের শাসন থাকলে নির্বাচনসহ সবকিছু ঠিকভাবে চলত।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘একটা প্রমাণ দেখান যেখানে কুশাসন করেছি। যদি কোনো কুশাসন করে থাকি তাহলে আদালতে যান। শুধু সমালোচনা করে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে হবে না।’