সুযোগ বাড়ল ব্যক্তিস্বার্থে ব্যাংক ব্যবহারের

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালকদের মেয়াদ ৯ বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করে এ সংক্রান্ত বিল পাস করেছে সংসদ। এ নিয়ে আর্থিক মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এ আইনকে ব্যাংক খাতের সুশাসনের অন্তরায় বলে অভিহিত করেছেন।

গত বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পরিচালক পদের মেয়াদ বাড়ানোর সংশোধনী প্রস্তাবটি যেভাবে আনা হয়েছে তা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা। তারা বলেন, ব্যাংক লুটপাটের মূলহোতা পরিচালকরা। তাদের সুবিধা দেওয়ার জন্য আইন সংশোধন করা হচ্ছে। তার চেয়ে পরিচালকদের মেয়াদ আজীবন করে দেওয়া হোক।

গত ৮ জুন ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০২৩ সংসদে তুলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। সংশোধনীর মূল প্রস্তাবে পরিচালক পদের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি ছিল না। ওইদিন বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। স্থায়ী কমিটিও পরিচালক পদের মেয়াদ নিয়ে কোনো সংশোধনী আনেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংকের পরিচালকদের মেয়াদ ১২ বছর করার কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না। এটা ৩-৬ বছর থাকলে ঠিক আছে। এ আইনের ফলে একজন ব্যক্তি ব্যাংকের ওপর দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করতে থাকবেন। এমনিই তো ব্যাংক পরিচালকদের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কমিটি চাপের মধ্যে থাকেন। এরপর নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর কারণে পরিচালকরা ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করবেন। এটা ব্যাংক কোম্পানি আইনের অন্তরায়। এ ছাড়া বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি না হলে সুবিধার বিষয়ে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, ইচ্ছাকৃত আর অনিচ্ছাকৃত কে ঠিক করবে। এক কথায় খেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই এ আইন করা হয়েছে।

এ ছাড়া সংসদে পাস হওয়া অন্য আইনটি হচ্ছে, ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত।

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, টাকার তো কোনো রঙ হয় না। এ আইনের ফলে গ্রুপভুক্ত কোম্পানির মালিকরা তার লোকসানি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে সেটা তার ভালো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করবে। কারণ লোকসানি কোম্পানি খেলাপি হলেও সে তার অন্য কোম্পানির ঋণ নিতে এখন আর সমস্যা হবে না। এই আইন কোনোভাবে ব্যাংকের জন্য ভালো হয়নি।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ আইনের দুটি জায়গা আমার কাছে দৃষ্টিকটু এবং আপত্তিকর মনে হয়েছে। একটি হচ্ছে, লাস্ট মিনিটে যেভাবে বিল উঠিয়ে সেটাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আর একটি হচ্ছে, একই ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যদি একটি খেলাপি হয় তাহলে অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তাকে দায়বদ্ধ করা যাবে না। প্রশ্ন হলো, কোনো ব্যক্তি তার একটা প্রতিষ্ঠানের নাম ঋণ নিয়ে ওই অর্থ অন্য জায়গায় সরিয়ে ফেলবে। এতে তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই? এই জায়গাগুলো আমার কাছে খারাপ লেগেছে। আর অন্য বিষয়গুলো ভালো।’

নতুন আইন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ওপর চাপ তৈরি করবে কি না জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন আইনে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিষয়ে যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেটি একটি ভালো দিক। আর এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেটির ভালো দিক এবং খারাপ দিক দুটিই আছে। দেখা গেল একটি কোম্পানির একটি প্রতিষ্ঠান লোকসানের কারণে খেলাপি হয়েছে। আর অন্য প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে ঋণ পরিশোধ করছে। তাহলে খেলাপি না হওয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া সমস্যা নয়। কিন্তু আমরা তো আইনের অপব্যবহার বেশি করি। যদি এমন কিছু হয় তাহলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যাংক পরিচালক একই সময়ে অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকতে পারবেন না। তবে এ আইন কার্যকর হওয়ার পর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে বীমা কোম্পানির পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সংশোধনী খসড়ায় কোনো ব্যাংক পরিচালকের একই সঙ্গে বীমা কোম্পানির পরিচালক পদে থাকার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো পরিচালক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে বিদ্যমান আইনে কিছু বলা নেই। কিন্তু নতুন আইনে কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালক হলে একই সময়ে তিনি অন্য কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি বা এসব কোম্পানির কোনো সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক থাকতে পারবেন না।

বিদ্যমান আইনে বিকল্প পরিচালক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও তার মেয়াদকাল এবং বিকল্প পরিচালকদের যোগ্যতা সম্পর্কে কিছু বলার নেই। নতুন আইনে এসব বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হচ্ছে। আইনে বলা হয়েছে, কোনো পরিচালক কমপক্ষে নিরবচ্ছিন্নভাবে তিন মাস বিদেশে অবস্থান করলে তার অনুপস্থিতির কারণে পর্ষদ চাইলে মূল পরিচালকের বিপরীতে বছরে সর্বোচ্চ একবার একজন বিকল্প পরিচালক নিযুক্ত করতে পারবেন। পরিচালক নিয়োগের যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো বিকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

নতুন আইনে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পাবে। সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার যোগ্যতা ও উপযুক্ততার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করবে।

এ ছাড়া ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিদেশ যাওয়া, বাড়ি-গাড়ি ও কোম্পানি নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ তাদের রাজনৈতিক দলের কমিটিতে না রাখার বিধান রেখে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অধিকতর সংশোধন করতে একটি বিল সংশোধন আনা হয়েছে। এ বিলে এক পরিবার থেকে তিনজনের বেশি ব্যাংক পরিচালক হওয়া যাবে না এরকম বিধান রয়েছে। সংসদে পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা শনাক্ত করা ও চূড়ান্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুটি পৃথক কমিটি গঠন করবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ে সময়ে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে।