দুদকও সামলাতে হবে বিএনপিকে

জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর কয়েক মাস পরেই। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি এ সময়ে তাদের আইন-আদালত, জামিন ও বিচার কার্যক্রমের শুনানি নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হবে। বিএনপিকে মোকাবিলা করতে হবে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক)।

সম্প্রতি দুদকের মামলায় হাইকোর্টে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ৯ বছর ও আমান উল্লাহ আমানের ১৩ বছরের সাজা বহালের রায়ের পর অস্বস্তি ও চিন্তা বেড়েছে বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীদের মধ্যে। সামনে আরও কঠিন সময় আসছে এ আলোচনা চলছে তাদের মধ্যে।

আইনজীবীদের ভাষ্য, বিএনপির মনোনয়নে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন কেন্দ্রীয়, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের এমন ৩০ থেকে ৩৫ জন শীর্ষ সারির নেতা দুদকের মামলায় বিচার ও সাজার ঝুঁকিতে রয়েছেন। 

উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মামলা পরিচালনা করেন এমন পাঁচজন এবং দুদকের মামলার পাঁচজনসহ মোট ১০ জন আইনজীবীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা হয়েছে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের। বিএনপির আইনজীবীরা প্রায় অভিন্ন সুরে বলেন, ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ১৫ বছর ধরে নেতাদের মামলা, জামিন, হাজিরা ও সাজা নিয়ে কঠিন ও অস্বস্তিকর সময় পার করছে। রাজনৈতিক কৌশল কিংবা মানসিক চাপে রেখে বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে সরকার দুদক ও আদালতকে ব্যবহার করবে, এটি অনুমিতই ছিল। দুদকের তৎপরতা তাদের ভাবিয়ে তুললেও তারা আইনি লড়াইয়ে থাকবেন বলে জানান।

দুদকের আইনজীবীদের বক্তব্যে ছাড় না দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিএনপির রাজনৈতিক মামলার আইনজীবীদের বক্তব্যে দ্বিমত পোষণ করে তারা বলেন, দুদকের চলমান মামলাগুলোর প্রায় সবই পুরনো। কার্যতালিকায় এলে এগুলোর শুনানি ও নিষ্পত্তি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এগুলোতে নির্বাচন বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আরোপের কোনো সুযোগ নেই।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কঠিন সময় পার করছি। সামনে আরও কঠিন সময় আসতে পারে। কারণ অতীতে কোনো সরকারই এমন ভৌতিক মামলা দায়ের করেনি। তবে, আমরা এখনো আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তে অটল আছি।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের হাতে অস্ত্র একটাই। সেটাই তারা প্রয়োগ করছে বছরের পর বছর। আমরাও আইনগতভাবে মোকাবিলা করে আসছি। যেহেতু তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি ফলে মামলা ও সাজা থাকবে। কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, কাকে সাজা দেবে সেটা সরকারের সাজানো একটা বিষয়।’

দুদকের কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কার্যতালিকাতেই দুর্নীতির পুরনো মামলাগুলো আছে। সে অনুযায়ী নিষ্পত্তি হচ্ছে। বিরোধীপক্ষের কে কী বলল তাতে কিছু যায়-আসে না। ৯ বছর আগের মামলা হাইকোর্টে পুনঃশুনানির জন্য পাঠানো হয়েছে। সেগুলোর কি নিষ্পত্তি হবে না? বিচারকরা দ- দিয়েছেন। এখানে রাজনৈতিক আবরণের প্রশ্নই ওঠে না।’

পুরনো মামলাতেই ঘুরপাক

সরকারের নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত হয়ে কারাগারের বাইরে আছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বিচারিক আদালতে তার বিরুদ্ধে চলমান নাইকো ও গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারে এমন গুঞ্জন রয়েছে আইনজীবীদের মধ্যে। নাইকো মামলায় গত ২৩ মে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে। গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় ইতিমধ্যে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছরের সাজার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এবং জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় ৭ বছরের কারাদ-ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে খালেদা জিয়ার করা আপিল বিচারাধীন রয়েছে। দুদকের কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, মামলাগুলো কার্যতালিকায় এলে এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা আন্তরিক হলে আপিল নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিএনপির আইনজীবীরা মনে করেন, দুটি মামলায় ১৭ বছরের সাজার পরেও অন্য মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির কারণ একটাই, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে দিতে চায় না। সাজাপ্রাপ্ত হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না বলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ইতিমধ্যে তার অভিমত দিয়েছেন। তবে বিএনপির আইনজীবীরা বলছেন, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।

লন্ডনে বাসরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিমধ্যে দুর্নীতির একটি মামলায় ১০ বছর ও আরেকটি মামলায় ৭ বছর, ২১ আগস্ট মামলায় যাবজ্জীবন এবং মানহানির একটি মামলায় দুই বছরের কারাদ- পেয়েছেন। আইনের দৃষ্টিতে তিনি পলাতক এবং আইনি মোকাবিলা করতে হলে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে দুর্নীতির আরেকটি মামলায় তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলার বিচার শেষ হতে পারে খুব শিগগির।  

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকার দুর্নীতির মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এ আসামিপক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য শেষে সাফাই সাক্ষ্য চলছে। এরপর যুক্তিতর্কের শুনানি। তারপর রায়। তিনি গ্যাটকো মামলাতেও আসামি। গ্যাটকো মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও আসামি।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এ তদন্ত কর্মকর্তার জেরা চলছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলুর মামলাটিতে সাতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এ সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপির আইনজীবীদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে এসব মামলা নিষ্পত্তির দিকে যেতে পারে।

বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তত ৩৫ জন নেতার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে দুদক তৎপর। চাপ সৃষ্টি করে বিএনপিকে আরেকটি প্রতারণামূলক নির্বাচনে নেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।’   

জোবাইদার মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে শিগগির

বিএনপির আইনজীবীদের কাছে অস্বস্তি নিয়ে এসেছে তারেকপত্নী জোবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলাটি। তারা বলেন, জোবাইদা রহমান কখনো সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না। ভবিষ্যতে আসবেন সে সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। স্বামী তারেক রহমানকে দুর্নীতিতে সহযোগিতা করার অভিযোগে মামলা হলেও দীর্ঘদিন সেটি আলোচনার বাইরে ছিল। এ মামলায় ১৪ বছর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ায় মামলার বিচারকাজ চলছে দ্রুতগতিতে। গত ১৩ এপ্রিল দুজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ হয়। আইনের ব্যাখ্যা ও উচ্চ আদালতের অভিমত অনুযায়ী, পলাতকদের পক্ষে আইনজীবীর শুনানির সুযোগ নেই। এ মামলায় ২১ জুন পর্যন্ত ৫৬ সাক্ষীর মধ্যে ৩১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মামলাটিকে ঘিরে ঢাকার আদালত এলাকায় কয়েক দিন মারামারি, হাতাহাতি, মিছিল-পাল্টা মিছিলে লিপ্ত ছিলেন বিএনপিপন্থি এবং রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের আইনজীবীরা। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ আইনজীবী। প্রতি কর্মদিবসে বিশেষ নিরাপত্তায় বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

বিচারিক আদালতে বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মামলায় শুনানি করছেন দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে জিয়া পরিবারের কেউ যেন আসতে না পারে, সে জন্যই এত তাড়াহুড়া। তারেক রহমান নির্বাচনের বাইরে থাকলে তার স্ত্রী সামনে চলে আসতে পারেন এমন ভাবনা থেকেই জোবাইদা রহমানকে লক্ষ্য করা হয়েছে।’

বিচারিক আদালতে দুদকের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিনের পর দিন সময় নিয়ে, উচ্চ আদালতে গিয়ে তারাই (বিএনপির আইনজীবী) মামলাগুলোকে দীর্ঘায়িত করেছেন। আমাদের কাজ মামলা পরিচালনা করা। কে কোন দলের সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। মামলা নিষ্পত্তির সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘একই মামলায় আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা অব্যাহতি পেয়েছেন। আমাদের বেলায় ব্যতিক্রম হচ্ছে। দুদক দুজনকে (আমান ও টুকু) নির্বাচন থেকে বারিত করল। এমন আরও অনেকের ক্ষেত্রে হতে পারে। নির্বাচন সামনে রেখে প্যানিক সৃষ্টি করতে অনেক মামলাই সরকার নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। তারা খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে দিতে চায় না।’