রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরি, অশালীন শব্দ উচ্চারণ ও চিৎকার করা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গতকাল বুধবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “বক্তব্য দেওয়ার সময় কেউ কেউ ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে চিৎকার করে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কি এগুলো মানায়? কবে আমরা শিখব? যাই হোক, অত্যন্ত দুঃখজনক।”
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি এ কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত সরকার নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, প্রথম শহীদ আবু সাঈদসহ শহীদদের আত্মত্যাগ ও আন্দোলনের বিভিন্ন দিক যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নিÑ এমন অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানায় জুলাই যোদ্ধাদের একটি অংশ। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কিছু নেতাকর্মীও প্রতিবাদে অংশ নেন। তখন রাষ্ট্রপতি ও বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এ সময় নিরাপত্তারক্ষীরা রাষ্ট্রপতি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘিরে রাখেন। বিশৃঙ্খলা ও হইচই চলতে থাকলে একপর্যায়ে আমন্ত্রিত বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের বেশিরভাগ একযোগে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান একপর্যায়ে তৎপর হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী সবার সঙ্গে কথা বলে প্রামাণ্যচিত্রের ত্রুটি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেন।
অনুষ্ঠান আবার শুরুর পর রাষ্ট্রপতি বক্তব্য দেওয়ার সময় বিদেশি অতিথিদের সামনে অসৌজন্যমূলক আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আজ এ দৃশ্যটি একেবারেই অনভিপ্রেত ছিল। ভুলত্রুটি তো হবেই মানুষের; সেটি আমরা সবাই মিলে শুধুরে নেব। কোনো কিছুই তো পারফেক্ট (নিখুঁত) না। কিন্তু এভাবে বিদেশি অতিথিদের সামনে যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে।’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ না করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আজকের এ ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবেন, যিনি পাশের দেশে বসে আছেন। তার জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, আবু সাঈদ বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, প্রতীক। জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারিতে (প্রামাণ্যচিত্রে) তার ছবি না থাকলে, এটি কোনো ডকুমেন্টারি নয়। তিনি যোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবিও এতে নেই। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (ইশরাক হোসেন) বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। এরপর সবার শান্ত থাকা উচিত ছিল। এটাকে পুষে রেখে সংসদের মতো ওয়াকআইট করা বাঞ্ছনীয় নয়।
বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপিকে এবং সেই সময় ধৈর্য ধারণ করার জন্য সরকার সমর্থকদের রাষ্ট্রপতি ধন্যবাদ জানান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিভিত্তিক গণমাধ্যমে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এত অন্যায়, অবিচার, খুন, গুম, মানিলন্ডারিং, হত্যা, নির্যাতন, আয়নাঘর এতে তাদের কোনো লজ্জাবোধ নেই। আবার বলে ডিসেম্বরে দেশে পদার্পণ করবে। আমরা অপেক্ষা করে আছি, আসেন দেশে।’
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে আরেকটি করব বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের জনগণের শাসন ও গণতন্ত্র চিরস্থায়ী করে যাব। আমরা রক্ত দিয়েছি এই দেশের জন্য, যুদ্ধে আহত হয়েছিলাম ১৯৭১ সালে, এ ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য নয়।’
একজন মা অন্ধ ছেলেকে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই যুবক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চোখ হারিয়েছে। যদি তারা যথাযথ মর্যাদা না পান এবং সামান্য চাওয়া-পাওয়ার জন্য মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তবে সেটি জাতির জন্য লজ্জার।
বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ জুলাইতে যারা আত্মহুতি দিয়েছেন, সেই পরিবারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা। এটা সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব। যারা আহত, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে, অঙ্গ হারিয়েছে, তাদের সুস্থ করে তোলা এই সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবে। বাংলাদেশ একটি নতুন যাত্রার সূচনা পর্বে দাঁড়িয়ে আছে। এ যাত্রাপথ সহজ নয়। মতের ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিদের সম্মাননাসূচক ক্রেস্ট প্রদান করেন। তারা অনুষ্ঠানে নিজেদের প্রত্যাশা ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম।
