বাইডেন-মোদির বিবৃতিতে নেই বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

যুক্তরাষ্ট্র সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যে যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দুই ঘণ্টা একান্ত বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় বিষয়টি জানানো হয়। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমেরিকা এবং ভারতের ‘ডিএনএর’ মধ্যে গণতন্ত্র রয়েছে। তিনি ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে জায়গায় অবস্থান করছে, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি সে রকম নয়। এর মৌলিক কারণ হচ্ছে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই গণতান্ত্রিক। সংবাদ সম্মেলনে মোদির আমলে ভিন্নমতাবলম্বী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেসব অভিযোগ তুলেছে, সেটি নিয়ে বাইডেনকে প্রশ্ন করা হয়। তবে তিনি সরাসরি সেই প্রশ্নের জবাব দেননি। আর মোদি তার দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি খারিজ করে দেন।

বিবিসি বলছে, যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মোদি এই প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তিনি তার নয় বছরের শাসনামলে কখনোই এ ধরনের সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেননি। সংবাদ সম্মেলনে একজন ভারতীয় এবং একজন আমেরিকান সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন। এই দুটো প্রশ্নই আগে থেকে নির্ধারিত ছিল। তিনি অনুবাদকের মাধ্যমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। মোদি বলেন, ভারত গণতান্ত্রিক দেশ; কোনো ধারণামাত্র নয়। ভারতের ধমনিতে গণতন্ত্র রয়েছে। ভারত গণতন্ত্রে বাঁচে। সংবিধানেও তা প্রতিফলিত। সরকারও গণতন্ত্রকেই আঁকড়ে আছে। কোনো সরকারি নীতিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নিয়ে কোনো বৈষম্য নেই।’

সিএনএন জানিয়েছে, যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। কারণ এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করার বিষয়ে ভারতের দিক থেকে তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। যৌথ সংবাদ সম্মেলন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের অবস্থান এবং ব্যাপক আলোচনার পরে ভারতও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে। পরে  বাইডেন-মোদির যৌথ বিবৃতিতে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনভিত্তিক নীতির মধ্য দিয়ে আরও শক্তিশালী, বৈচিত্র্যময় মার্কিন-ভারত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়া জাতিসংঘের রীতিনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বর্তমান যে বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটাকে সম্মান জানানোর প্রতি জোর দিয়েছে দুই পক্ষই। তাদের কথা হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও। মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে জঙ্গি হামলার ক্ষেত্র হিসেবে যেন ব্যবহার না করা হয়, সে বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে।

অবনতি ঘটতে থাকা মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুই নেতা। দেশটিতে নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়ে গঠনমূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে। আল-কায়েদা, আইসিস, লস্কর-এ-তাইয়েবার মতো জাতিসংঘের তালিকাভুক্ত জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক জোট কোয়াডকে আরও কার্যকরী করে গড়ে তোলার ব্যাপারে একমত হয়েছে দুই পক্ষই।

প্রতিরক্ষাবিষয়ক দুই দেশের অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবারের বৈঠকে। সামরিক পর্যায়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা পরমাণুবিদ্যা সংযোজনের পাশাপাশি ভারতের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করতে আমেরিকার সহযোগিতার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

মোদির এই সফর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দুটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজার বৃদ্ধি, অন্যটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ভারতকে এমনভাবে সাহায্য করা, যাতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের মোকাবিলা সহজতর হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদির দিক থেকে আগ্রহ ছিল অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষায় ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের সীমান্ত সুরক্ষিত করা ও দেশের রাজনীতিতে নিজের অধিষ্ঠান প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া। আর শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়েছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা মুখে বলা হলেও দুই দেশের স্বার্থের বিষয়টিই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  এই সফরে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, সেমিকন্ডাক্টর এবং খনিজ সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে।