বনস্পতির ছায়া দিচ্ছেন পাপন

নাজমুল হাসান পাপনের আসল পরিচয় কী?

সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানের ছেলে। তবে ক্রিকেট বোর্ডের অধীশ্বর পরিচয়ই বেশি পরিচিত হতে পছন্দ করেন। ২০১২ সাল থেকে তিন মেয়াদে বিসিবির সভাপতি তিনি। ক্রিকেটে সবকিছু সঁপে দিয়ে কখনো কখনো ভুলে যান, কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্যের পরিচয়টা। বাইশ গজ কখনো কখনো ভুলিয়ে দেয় দেশের বৃহত্তম ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের গুরু দায়িত্বটাও। একই সঙ্গে পাপন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতিরও সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ অ্যালামনাই ক্লাবেরও প্রধান। ক্রিকেটে এতটাই মজে থাকেন যে, অন্য পরিচয়গুলো গুরুত্বের তালিকায় চলে যায় নিচের সারিতে। তবে অন্য পরিচয়গুলোর ভার অনেক। সেই দায়িত্ববোধ থেকে কদিন আগেই কি না ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর কথা বলেছেন। এসব পরিচয় ছাপিয়ে পাপন আরেকটা পরিচয়ে স্থান পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের প্রার্থনায়। সেই পরিচয়ে পাপন শুধু ক্রিকেটের নন; ক্রিকেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি গোটা ক্রীড়াঙ্গনের। অনেক দিন ধরে বনস্পতির ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন গোটা ক্রীড়াঙ্গনকে।

ক্রিকেট বোর্ড ছাড়ার কথা প্রায়ই বলেন পাপন। যখনই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেন, তখনই মোহাম্মদ মহসিনের আকাশে জমে কালো মেঘ। এই মহসিন বিসিবি সভাপতির একান্ত উদ্যোগে চিকিৎসাধীন দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপার মহসিন নন। এই মহসিন বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মহসিন। ফোনের ওপাশ থেকে তার কণ্ঠটা হাহাকারের হয়ে বাজল, ‘পাপন স্যার আমাদের বড় আশ্রয়। যখন শুনলাম উনি ক্রিকেটে থাকতে চান না, মনটা শঙ্কায় ভরে ওঠে। সবসময় চিন্তা করি, পাপন স্যার যখন আছেন, খেলা ছাড়লেও এই পঙ্গুজীবনটা নিয়ে ভাবতে হবে না। তিনি নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। উনি চলে গেলে আমরা কোথায় যাব?’

কদিন আগে এক জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক পাপনের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘পাপন ভাই হচ্ছেন ক্রীড়াঙ্গনের একটা ক্যারেক্টার। তিনি যেখানেই থাকবেন, যে অবস্থাতেই থাকবেন; সংবাদকর্মীদের জন্য সংবাদের খোড়াক জুগিয়ে যাবেন। সেটা নেতিবাচক হোক, কিংবা ইতিবাচক।’ কথাটা নির্জলা সত্য। তাই তো মিডিয়া বলেন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া পাপন ভীষণ পপুলার একটি ক্যারেক্টার। আধুনিক দুনিয়ায় টিকটক, রিল, ট্রল, ভাইরাল শব্দগুলো ব্যাপক প্রচলিত। মোক্ষম একটা ঘটনা (মান যেমনই হোক) ভিডিও করে অন্তর্জালে ছেড়ে দিন। দেখবেন মুহূর্তেই হাজারো মানুষ হামলে পড়বে তাতে। আর বিষয়বস্তু পাপন হলে তো কথাই নেই। তাকে নিয়ে কিছু ছাড়লেই হিট। লাখ লাখ শেয়ার, ক্লিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পকেটস্থ হবে মার্কিন মুদ্রা। তবে মিডিয়া-সোশ্যাল মিডিয়ার কটাক্ষ সন্তর্পণেই এড়িয়ে যান পাপন। দেশের ফুটবলের দ-মু-ের কর্তার (নামটা নিশ্চয়ই সবার জানা) মতো প্রতিক্রিয়া দেখান না কিংবা আইনি পদক্ষেপও নেন না। কারণ পাপন থাকতে চান একেবারে নিজের মতো। ক্রিকেটটাকে সাজাতে চান নিজস্ব ছকে। সেটাই হয়তো অনেকের সয় না। পাপনের সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হলেই রক্ষে নেই। মিডিয়া-সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে শুরু হয় নানা রসিকতা।

তাই বলে মিডিয়াকে কখনোই পাপন শত্রু ভাবেননি। তাই তো কদিন আগে ক্রিকেটের উত্তরণের বড় একটা কৃতিত্ব দিয়েছেন মিডিয়াকে উদাত্তভাবে। কোনো সংবাদকর্মী অসুস্থ হলে চুপিসারে পাপন বাড়িয়ে দেন সহযোগিতার হাত। বিসিবির সহযোগিতায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসা মিডিয়াকর্মীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। শুধু তাই নয়, পরিচয় না জানিয়ে বিসিবি করোনাকালে অনেক সাংবাদিককে দিয়েছে অর্থ সহায়তা।

পাপনের পুরো ক্রীড়াঙ্গনের বনে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিডিয়ার অবদানও কম নয়। যেমনটা হয়েছে কিংবদন্তি গোলকিপার মহসিনের ক্ষেত্রে। মিডিয়ায় যখন চাউর হলো ভালো নেই সোনালি সময়ের তেকাঠির বিশ্বস্ত প্রহরী, যেচে পড়ে নিজেই উদ্যোগী হয়ে উঠলেন পাপন। নিলেন মহসিনের আর্থিক ও আইনি সমস্যা নিরসনের দায়িত্ব। ধরে-বেঁধে মহসিনকে সুস্থ করে তুলতে ভর্তি করালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। সেখানে পুরোদমে চিকিৎসা চলছে মহসিনের। জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া এই ফুটবল নায়কের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন পাপন। শুধু মহসিন নন, ফুটবলের অনেক অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন পাপন। এমনকি বাদ যায়নি প্রয়াত ফুটবল রেফারির পরিবারও।

২০১২ সালে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ক্রিকেটের পাশাপাশি নিজের দরজাটা খোলা রেখেছেন গোটা ক্রীড়াঙ্গনের জন্য। তবে এই কাজটা তিনি করতে চান পর্দার আড়ালে থেকে। তারপরও সব তো আর চাপা রাখা যায় না। এই যেমন বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন, বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশন, বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনকে দিয়েছেন বড় অঙ্কের অনুদান। নারী ফুটবলারদের সাফ জয় করতে দেখে তৎক্ষণাৎ দিয়েছেন আকর্ষণীয় অর্থ পুরস্কারের ঘোষণা। এ ক্ষেত্রে পাপনের দর্শনটা পরিষ্কার। শুধু নিজে ভালো থাকলেই চলবে না। আশপাশের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে হবে। এই মন্ত্রটা হৃদয়ে গেঁথে তিনি দাঁড়ান হাজারো দুস্থ ও সমস্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে। করোনা অতিমারীর সময় শুধু অন্য খেলার দুস্থ খেলোয়াড়, সংগঠকদের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর হাত দিয়ে এ প্রস্থে দিয়েছেন ৫০ লাখ টাকার অর্থ সহায়তা। নিজ উদ্যোগে জেলায় জেলায় পৌঁছে দিয়েছেন খাদ্যসামগ্রী, যাতে ভীতিকর সময়টাতে মিলেছে খানিকটা স্বস্তি। বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগী ক্রীড়া সংগঠক পরিষদের মহাসচিব, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপমহাসচিব, বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকুর কাছে পাপন এখন গোটা ক্রীড়াঙ্গনের একজন অভিভাবক, ‘আমাদের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক। তবে তার পাশাপাশি পাপন সাহেব নিজেকে ক্রীড়াঙ্গনের আরেকটি নির্ভরতার জায়গায় নিয়ে গেছেন। ক্রিকেটের বাইরের খেলাগুলো এগিয়ে নিতে ওনার সহমর্মিতা অনুকরণীয়। বাংলাদেশের অনেকগুলো ক্রীড়া ফেডারেশন আছে। এর মধ্যে অনেক খেলাই সারা বছর চালানো যায় না আর্থিক সংকটের কারণে। পাপন সাহেব সে সব সংকট নিরসনে সবসময় উদ্যোগী হন।’

গোটা ক্রীড়াঙ্গনকে নিয়ে পাপনের দুর্বলতার বিষয়টি জানেন ও মানেন তার সহযাত্রীরাও। তাই যখনই যেকোনো সহায়তার আবেদনে সাড়া দেওয়ার প্রশ্নে পাপন বোর্ডের ভেতর থেকেও পান ইতিবাচক সমর্থন। বোর্ড পরিচালক জালাল ইউনুস জানালেন, ‘ক্রিকেটকে পাপন অনেক ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসাটা এখন সম্প্রসারিত হয়েছে গোটা ক্রীড়াঙ্গনে। অন্যদের ভালো রাখার চেষ্টা নিয়ে বোর্ডে অনেক আলোচনা হয়েছে। লিখিত সিদ্ধান্ত হয়তো হয়নি, তবে মৌখিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমরা কাউকে ফেরাব না। পাপনের নেতৃত্বে আমরা চাই অন্য খেলা ও খেলার মানুষদের ভালো রাখতে।’ পাপনের কাছে ছোট খেলার গুরুত্বও অনেক বড়। বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী যেমন জানালেন, বিসিবি সভাপতির কাছে যখনই কোনো সহায়তার জন্য গিয়েছি, নিরাশ করেননি। আমরা পঞ্চম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করেছি বিসিবির পৃষ্ঠপোষকতায়। আগামী মাসে মালদ্বীপে একটি আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নিতে বিসিবির ইতিবাচক সহায়তার আশ্বাস পেয়েছি। পাপন ভাই যেভাবে আমাদের ছোট খেলাগুলোকে আগলে রাখছেন, বিশ্বাস করি, তাতে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গন একদিন ঘুড়ে দাঁড়াবে। সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বদরুল সাইফ একই সঙ্গে ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। এই সংগঠক বলেন, ‘পাপন ভাই শুধু সাঁতারকে পৃষ্ঠপোষকতা দেননি। ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাকেও ১০ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। আসলে টাকা থাকলেই হয় না, মানুষকে সহযোগিতা করার মনটাও থাকতে হয়। সেটা আমাদের পাপন ভাইয়ের আছে।’

খুব বেশি দিন হয়নি পাপনের ক্রীড়াঙ্গনে সক্রিয় পদচারণা। তবে অল্প সময়ে বড্ড আপন হয়ে উঠেছেন। বনস্পতির ছায়া দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। যেখানে কোনো বিতর্ক-সমালোচনাই তাকে স্পর্শ করে না।