বাড়ি ফেরার যাত্রাই হলো শেষযাত্রা

ঈদুল আজহা এলেই পরিবার সাথে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করে নিতে স্ত্রী আর তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরত আলমগীর খান। এবারও পরিবারের সবাই মিলে ঈদে সুন্দর সময় কাটাবেন এমন আশায় কিনেছেন কোরবানির গরু। আর সে কারণেই ঈদের এক সপ্তাহ আগেই পরিবারের সবাইকে পাঠিয়েছিলেন বাড়িতে। কিন্ত নির্মম নিয়তি বাড়ি ফেরার সে যাত্রাই হলো তাদের শেষযাত্রা।

গতকাল শনিবার ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মর্মান্তিক ভাবে নিহত হয় গাড়ির চালকসহ ৮ জন।এই আটজনের মধ্যে সাতজনই আলমগীর খানের আপনজন। তিন সন্তান, স্ত্রী, শাশুড়ি, শ্যালিকা ও শ্যালিকা পুত্রকে হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েছে আলমগীর। পরিবারের সাত সদস্যকে হারিয়ে কিছুই বলতে পারছেন না তিনি। কেবল দু চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে পানি, নির্বাক দৃষ্টিতে খুঁজে ফিরছেন আপন জনের মুখ। এসময় পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের কান্নায়,আহাজারিতে শোকের ছায়া নেমে আসে পুড়ো এলাকায়।

এদিকে, গতকাল মরদেহগুলো বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরই গোসল এবং অন্যান্য সব কাজ শেষে সন্ধার পর রাতেই দাফন সম্পন্ন করা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, আলমগীর খানের অসুস্থ শাশুড়ি ৫০ বছর বয়সী তাসলিমা বেগমের চিকিৎসা শেষে ঈদকে সামনে রেখে স্ত্রী কমলা বেগম ছেলে আরিফ, হাসিব ও দেড় বছর বয়সী মেয়ে হাফসা এবং শ্যালিকা বিউটি পারভীন ও তার ছেলে রিফাতসহ ৭সদস্যকে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে বাড়ি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম এলাকায় বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ের একটি ফ্লাইওভারের রেলিংয়ে ধাক্কা দিলে গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সটিতে আগুন ধরে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ৭জন মারা যান।

পরে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা যান গাড়ির চালক মৃদুল মালো। এ ঘটনার পর গতকাল বোয়ালমারীতে মরদেহগুলো পৌঁছানোর পর এক হৃদয় বিধায়ক দৃশ্যের অবতরণ হয়। এ সময় এলাকাবাসীসহ স্থানীয় লোকজন এবং আপন আত্মীয়-স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় কান্না জড়িত কণ্ঠে আলমগীর খান বলেন, পরিচিত গাড়ি চালক আগের দিন একটি ভাড়া নিয়ে ঢাকায় আসে। সারারাত নির্ঘুম চালক সম্ভবত বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল যে কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। চালকদের খামখেয়ালি গাড়ি চালানোতে যাতে আর কারও পরিবার এ ভাবে শেষ না-হয়ে যায় সে জন্য সরকারে কাছে সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে আনার জোর দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় বোয়ালমারী উপজেলা চেয়ারম্যান এম এম মোশাররফ হোসেন মুশা মিয়া বলেন- ঈদের আগে একটি মর্মান্তিক ঘটনার স্বাক্ষী হলাম, হৃদয় বিদারক এমন ঘটনা সত্যি অবর্ণনীয়। পরিবারটি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া কথা জানান তিনি। এছাড়াও ভবিষ্যতে যে কোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকবেন বলেও জানান জানান।

এদিকে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার দুই দিনের সময় দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। যেখানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে হাইওয়ে পুলিশ, স্থানীয় ভাঙ্গা থানার সার্কেল,ফরিদপুরের পুলিশ সুপার দপ্তরের একজন, ফায়ার সার্ভিসের একজন ও বি আর টি এর সদস্যদের নিয়ে এই তদন্ত কমিটির করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বর্তমানে একই পরিবারের সাতজনের মৃত্যুর খবরে গোটা বোয়ালমারী উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।