টুইটার বা ফেসবুক কোনো একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎই একটা ছবি ভেসে উঠল। উঠল তো উঠল, এমন একটা সময়ে, যখন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদিজি আমেরিকা সফর করছেন। খোদ মার্কিন বড় কর্তা বাইডেনের আমন্ত্রণে। ছবিটা বহু পুরনো। সাদাকালো। ঈষৎ বিবর্ণ। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু স্বাধীনতার পর সেবার আমেরিকা গেলে কীভাবে স্থানীয় জনগণ, অনাবাসী ভারতীয়রা জাত, ধর্ম নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাগত জানাচ্ছেন।
জওহরলাল নেহরু সম্পর্কে যত সমালোচনাই থা না কেন, মতিলাল নেহরুর ছেলে যে স্বাধীনতা আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। যেমন প্রশ্ন নেই নেহরুর অসাম্প্রদায়িক মন নিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পরে কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থি লবি, মূলত বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে তাকে কোণঠাসা করার অনেক চেষ্টা করলেও জনগণের ভালোবাসা নেহরুর সঙ্গে ছিল। ইদানীং এ দেশের যে হার্ডকোর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির রমরমা বাড়ছে, সে সময়ে সত্যি মনে হয় নতুন করে সামনে আনা দরকার পন্ডিত নেহরুর উদার, অসাম্প্রদায়িক চিন্তাকে।
পুরনো ছবিতে স্পষ্ট, আমেরিকার জনমনে নেহরুর প্রতি টান গভীর ও স্বতঃস্ফূর্ত। যে কোনো ফটোগ্রাফারকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন যে পুরনো হলেও সাদাকালো ছবির ওপর তাদের আকর্ষণ বেশি। সাদাকালো রঙের গভীরতা অনেক।
এই ছবি দেখতে দেখতে, সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমেরিকা সফরের যাবতীয় কার্যকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ নামচা পড়তে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে তুলনা চলে আসছে। বলা বাহুল্য, নেহরু নিজেই ছিলেন সবদিক দিয়ে এক আইকন ধর্ম ও জোটনিরপেক্ষ ভারতের। ফলে সাদাকালো রঙের ছবিতেও তিনি ছিলেন বর্ণময়। আক্ষরিক অর্থেই গণতান্ত্রিক ভারতের আইকন। চলাফেরা, কথা বলার মধ্যে একই সঙ্গে ছিল আভিজাত্য ও পা-িত্য। আভিজাত্য এখানে বংশ গৌরবের নয়। ইনটেলেক্ট ও বাগ্মিতার।
এখনকার প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত বাগ্মী। ভালো অভিনেতা। চলনে বলনে নিজেকে ঠিক ঠিকভাবে তুলে ধরতে দক্ষ। নেহরু আমলের সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ মোদিজির নেই। তিনি মুখে বলেন বটে, গণতন্ত্রের প্রতি তার অগাধ আস্থা, বাস্তবে তা কতটা সত্যি তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, সবকা সাথ সবকা বিকাশ। আদৌ নিজেই তা মানেন বলে মনে হয় না।
নরেন্দ্র মোদি মূলত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রচারক। যে আরএসএসের এজেন্ডাই হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে দেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি বাদ দেওয়া। আরএসএস বিশ্বাস করে অখণ্ড ভারতে। এ দেশের কয়েক হাজার কোটি টাকায় নতুন তৈরি সংসদ ভবনের গায়ের ম্যুরালেও জ্বলজ্বল করছে তাদের এই কথিত বিশ্বাস। নরেন্দ্র মোদির কয়েক বছর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া সব পড়শি দেশের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। হালে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর নেপাল এ দেশের আদিপুরুষ সিনেমাটি নিষিদ্ধ করেছে। ভুটানও ইদানীং নানা কারণে ভারতের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে।
সরকারিভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হলেও সে দেশের জনগণের বড় অংশ নানা বিষয়ে ভারতের ওপর ক্ষুব্ধ। তবুও এ কথা মানতেই হবে যে, নরেন্দ্র মোদির সরকার শক্তিধর আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক যে সম্পর্ক গড়ে তুলছে তাতে তার পক্ষে আত্মবিশ্বাসী হয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা অনেক সহজ হবে। বাজার অর্থনীতির যুগে এই আধিপত্য বিস্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে শক্তিশালী দেশ হিসেবে চীনকে টেক্কা দিয়ে এক নম্বর হওয়া। চীনকে চাপে রাখতে আমেরিকারও প্রয়োজন ভারতকে। আজকের দুনিয়ায় বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় উপকরণ, অস্ত্র বিক্রি। সেদিক দিয়ে ভারতের মতো বড় বাজার দুনিয়ায় বিরল। অস্ত্র উৎপাদক দেশ হিসেবে আমেরিকার কাছে ভারতের কদর স্বার্থসংশ্লিষ্ট, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। খেয়াল করে দেখবেন পৃথিবীর সবচেয়ে যুদ্ধপ্রেমী তিন দেশ আমেরিকা, ইসরায়েল ও ভারত হালে গলায় গলায় বন্ধু হওয়ার দৌড়ে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী।
যে প্যালেস্টাইন আন্দোলনের প্রতি বরাবর ভারতের সমর্থন ছিল। এখন তাদের চরম শত্রু ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বড় চোখে লাগে। নরেন্দ্র মোদির এবারের আমেরিকা সফরের শেষে ভারত ঠিক কী কী পেল তা এখনো পরিষ্কার নয়। নিশ্চিত সরকারি সফরে আমেরিকার সংসদের যৌথ কক্ষে এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ কূটনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে সন্দেহ নেই। পাশাপাশি এ সৌভাগ্য খুব কম রাজনীতিবিদদের হয়েছে এও ঠিক। এতে প্রমাণ করার চেষ্টা আছে যে, ভারত এখন এক সুপার পাওয়ার। ভারতের নাগরিক হিসেবে এ তো শ্লাঘার বিষয়। কিন্তু যে দেশে আজও অর্থনীতি যথেষ্ট দুর্বল, বেকারি, না খেতে পেয়ে, ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যা যেখানে রোজকার ঘটনা, যে দেশে শিশুমৃত্যু, নারী নির্যাতন ক্রমবর্ধমান, যেখানে দুর্নীতি গগনচুম্বী, সেখানে এই যুদ্ধাস্ত্রের অহমিকা অসহনীয়। সুপার পাওয়ার বলতে একদা বুদ্ধের দেশ কত রকম অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র আমদানি করতে পারছে, এই যদি মাপকাঠি হয়, তাহলে তা সেই দেশের পক্ষে দুর্ভাগ্য।
এমন এক সময়ে মোদিজি আমেরিকায় গিয়ে কিছু এলিট ভারতীয়ের গদগদ উল্লাসের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, যখন মণিপুরের দেয়ালে দেয়ালে নরেন্দ্র মোদি নিরুদ্দেশ বলে পোস্টার পড়ছিল। অশান্ত, জাতি দাঙ্গায় বিধ্বস্ত মণিপুর নিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা বিস্ময়কর ও দুঃখজনক। নরেন্দ্র মোদি এমন এক সময়ে আমেরিকা গিয়ে আমাদের মহান গণতন্ত্রের গুণকীর্তন করছেন, তখন হয়তো তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে, আমাদের সেরা কুস্তিগীর মেয়েদের ওপর নির্মম অত্যাচার নামিয়ে এনেছে ভারত সরকারের পুলিশ। ভুলে গিয়েছিলেন, মেয়েরা কুস্তি ফেডারেশনের কর্তার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছিলেন। বিচার না পেয়ে তারা বাধ্য হয়ে যন্তরমন্তরে ধরনায় বসলে টেনেহিঁচড়ে তাদের পুলিশভ্যানে তোলা হয়েছিল। মুখে যিনি বেটি বাঁচাও বলে মিটিং মিছিলে খৈ ফোটান, তিনি অজ্ঞাত কারণে তার দেশের সোনার মেয়েদের কান্না শুনেও চুপ ছিলেন। হতে পারে, অভিযোগের তীর যার দিকে, সেই কুস্তিকর্তা ব্রিজভূষণ শরণ সিং বিজেপির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য।
বড়মুখে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। যা নিয়ে মার্কিন মুলুকের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন প্রশ্ন তুলে বিক্ষোভ জানিয়েছেন। শুধু মানবাধিকার সংগঠন কেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের বিরাট অংশ মোদির ভারতে ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। অনেক সদস্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ বয়কট করেছেন।
নরেন্দ্র মোদি সম্ভবত দেশের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি পারতপক্ষে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হতে চান না। একান্ত অনুগত মিডিয়া হলে অবশ্য আলাদা কথা। মোদির এই মিডিয়া ফোবিয়া সম্ভবত দুই হাজার দুই সালে গুজরাট গণহত্যায় তার ভূমিকা নিয়ে করণ থাপার খোলাখুলি প্রশ্ন তোলার পর থেকেই। সেই ইন্টারভিউতে উত্তর না দিয়ে তার-টার ছিঁড়ে রেগে মেগে মোদিজি চলে যাওয়ার পর থেকে কখনোই আর মিডিয়ার মুখোমুখি হতে স্বচ্ছন্দ হননি। গুজরাট আজও তাকে নীরবে তাড়া করে। এই আমেরিকাই একদিন নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল গুজরাটযোগের কারণে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে পরিস্থিতি বদলে গেলেও, এবারের আমেরিকা সফরেও বিদেশি মিডিয়া বারবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল গুজরাট প্রসঙ্গ ও তার রাজত্বকালে সংখ্যালঘু মুসলমান, আদিবাসী ও দলিত নির্যাতনের প্রশ্নে।
ফলে একশ্রেণির মোদিভক্ত, অনুগত মিডিয়া যত জোর গলাতেই ঢাক পেটান, মোদিজি আমেরিকা জয় করে ফিরলেন। বাস্তবে তা হয়নি। তার সফর শুধুই ফুল বিছানো পথে হয়নি। পথে পথে কাঁটাও ছিল যথেষ্ট। নরেন্দ্র মোদিকে বুঝতে হবে তার সমালোচকরা সবাই দেশদ্রোহী নন। বরং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আসল দেশভক্ত। তারা দেশের সংবিধান বাঁচাতে চায়। দেশকে বাঁচাতে মুখে গণতন্ত্রের গুণকীর্তন করলে চলবে না। কাজে গণতন্ত্রের পথ অনুসরণ করতে হবে। না হলে সুপার পাওয়ার ভারত জার্মানির ফ্যাসিস্ট শক্তির মতোই একদিন ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। বাঘ মনে হলেও সবসময় সে বাঘ নাও হতে পারে। কাগুজে বাঘকেও কখনো কখনো দূর থেকে ভয়ংকর লাগে।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com