ফেনীর ছাগলনাইয়ায় ছোট বোনকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় রবিউল হক শাহেদ (২০) নামে এক তরুণকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে তিন দিন আগে। কিন্তু পুলিশ এখনো কাউকে আটক করেনি। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের কাছে বিচার চাইতে গিয়ে তার কার্যালয়েই ছুরিকাঘাত করে এ তরুণকে হত্যা করা হয়। যারা হত্যা করেছে তারা অপরিচিত নয়। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের চাপে পুলিশ তাদের ধরছে না এমন অভিযোগ শাহেদের পরিবারের।
শাহেদ হত্যার সঙ্গে জনপ্রতিনিধিরা জড়িত বলেও অভিযোগ করেছেন তার মা বিবি মরিয়ম। তিনি বলেছেন, ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা রহস্যজনক।
হত্যাকান্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও মূলক শাস্তির দাবিতে কর্মজীবী নারী আন্দোলন ছাগলনাইয়া শাখার আয়োজনে শহরের জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য শিরীন আক্তার। এর আগে সকালে তিনি উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামে শাহেদের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারকে সান্ত¡না দেন।
এ সময় সংসদ সদস্য শিরীন আক্তার বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু তারপরও মা-বাবার সামনে নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে। খুন ও ইভটিজিং আজকে সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।’
শাহেদের মা বিবি মরিয়ম বলেন, ‘দুজন মেম্বারের চোখের সামনে আমার ছেলেকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছে। যারা হত্যা করেছে তারা সরকারদলীয় নেতাদের লোকজন। নেতারাই তাদের লালন-পালন করে।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার আজ (রবিবার) তিন দিন হলেও চেয়ারম্যান-মেম্বার কেউ আমার পরিবারের খবর নেয়নি। আমি একজন নিরীহ খেটেখাওয়া মানুষ। বড় আশা ছিল ছেলে বড় হয়ে পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু আমার ছেলেকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি ছেলে হত্যার বিচার দাবি করেন।
কর্মজীবী নারী আন্দোলন শাখার সমন্বয়ক মাহমুদা আক্তারের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন, কর্মজীবী নারী আন্দোলন কেন্দ্রীয় নেত্রী আনজুমান আরা, ছাগলনাইয়া উপজেলার সমন্বয়ক রোকেয়া সুলতানা লোপা প্রমুখ।
শাহেদ এক্সকাভেটরচালকের সহকারীর কাজ করতেন।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে শাহেদ ছোট বোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শুক্রবার বিকেলে শুভপুর ইউনিয়নের শমসের গাজীদীঘি এলাকায় বেড়াতে যান। সেখানে কয়েক তরুণ তার বোনকে উত্ত্যক্ত করে। তিনি প্রতিবাদ জানালে তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়।
সেখান থেকে ফিরে শুভপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ফজলুর রহমানের কাছে বিচার চান শাহেদ। ইউপি সদস্য উভয়পক্ষকে সন্ধ্যায় সালিশে ডাকেন। সেখানেই তাকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়।
জানা গেছে, ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেলের নেতৃত্বে ও ছত্রছায়ায় মাদকবাণিজ্য ও বালু ব্যবসার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। এ দুই রমরমা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ছাগলনাইয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন শুভপুর অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে মাদক কারবারি ও বালু ব্যবসা নির্বিঘেœ চালিয়ে যেতে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি করেছেন চেয়ারম্যান সোহেল। ওই গ্রুপের বেশিরভাগ লোককে শুভপুর ইউনিয়নের মেম্বার, চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন সোহেল। আর নিজের অবৈধ কাজে তাদের ব্যবহার করেন তিনি। ওই গ্রুপ শুধু অবৈধ কাজই নয়, শুভপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সজীব, ৬ নম্বর চম্পকনগরের মেম্বার মোতাহার সোহেলের মাদক ও বালু ব্যবসার পাহারাদার। এ দুজনের ছত্রছায়া ওই এলাকায় গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। এ কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ইউনিয়নের নারীরা নির্যাতিত হয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।
এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাই শাহেদের বোনকে উত্ত্যক্ত করে, ওড়না টেনে নিয়ে যায়। গত শুক্রবার এ ঘটনার পর সন্ধ্যায় উপজেলা চেয়ারম্যান সোহেলের ‘বাহিনীর’ সদস্য মেম্বার সজীব ও মোতাহারের কাছে বিচার চান শাহেদ ও তার বাবা মানিক মিয়া। শুভপুর ইউনিয়নে একটি ঘরে বসে বিচারকাজ চলা অবস্থায় সবার সামনে শাহেদকে বুকে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। সবার সামনে শাহেদ ছটফট করলেও বাঁচাতে আসেনি কেউ। পরে মানিক মিয়া ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই মৃত্যু হয় তার।
এ ঘটনায় মামলা হলেও স্থানীয়রা দাবি করেন, সোহেল তার সন্ত্রাসী ‘বাহিনীকে’ রক্ষা করতে পুলিশকে চাপ দেন। ফলে খুনের ঘটনার মূল হোতারা ধরা পড়ছে না। তাদের পরিবর্তে নিরপরাধ অনেককেই পুলিশ ওই মামলা গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে।
গতকাল এ প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয় লোকজন দাবি করেন, সজীব ও মোতাহার মেম্বারের আশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা শাহেদকে খুন করে।
শাহেদদের প্রতিবেশী কল্পনা আক্তার আহাজারি করে বলেন, ‘আজকে শাহেদ মারা গাছে। কাল আমার ছেলে মারা যাবে। এভাবেই চলতে থাকবে সন্ত্রাসীদের তা-ব।’
স্থানীয় রহিম মিয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনারা চলে যাওয়ার পর ওরা এলাকায় এসে আবার তাণ্ডব চালাবে। সব জানি, এরা কারা। আমরা কী করব? এখন ভয় পাচ্ছি আবার অন্য কোন পরিবারের সদস্য মারা যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাদক ও বালুমহালকে কেন্দ্র করেই কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের এখানে আনা হয়েছে। তারা বহিরাগত। তাদের লালন-পালন করে উপজেলা চেয়ারম্যান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার।’
শাহেদের বাবা মানিক মিয়া বলেন, ‘সজীব ও মোতাহার মেম্বারের উপস্থিতিতে আমার ছেলেকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পুলিশ উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে নিরপরাধ মানুষকে মামলায় আটক করছে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেলকে গতকাল রবিবার একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। ফোনে খুদে বার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া দেননি।
ছাগলনাইয়া থানার ওসি সুদ্বীপ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা কয়েকজনকে আটক করেছি। তদন্তের স্বার্থে এখনো কিছু বলব না।’ তিনি বলেন, এলাকাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় দীর্ঘদিন থেকে মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের ঘাঁটি। শাহেদের পরিবার সজীব ও মোতাহারকে অভিযুক্ত করছে, কিন্তু পুলিশ তাদের এখনো গ্রেপ্তার করছে না। এর জবাবে ওসি সুদ্বীপ বলেন, তাদের নাম মামলার এজাহারে নেই।