নাহেলরাই কেন গুলি খায়

মৃত্যু অনিবার্য। এটা জেনে বা না জেনে, মেনে বা না মেনে অপ্রত্যাশিত এবং অনেক অকাল মৃত্যু দেখতে হয়। এসব মৃত্যু আমাদের জীবনের অ্যাবসার্ডিটি নাকি মৃত্যুর অনিবার্যতাকে প্রতিষ্ঠা করে সেটা নিয়ে বিস্তর আলাপ হতে পারে– অবৈধ সাগরপথে, বিপৎসংকুল সীমান্ত, যুদ্ধের-সংঘাতের ভূগোল ছেড়ে অথবা ভাগ্যান্বেষণে নিজ ভূমি ছেড়ে যাওয়া অভিবাসী জীবনে। ‘অ্যাবসার্ডিটি’কে আলবেয়ার কামুর মতো করে ভাষা দিতে আর কোনো লেখক পেরেছিলেন বলে জানা নেই। কামুর সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’। কামুর জন্মশতবর্ষে এই আউটসাইডার এবং ফরাসি ঔপনিবেশিকতা নিয়ে আলোচনা বেশ জমে উঠেছিল। চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সে একজন পুলিশ কর্মকর্তা দিনদুপুরে একটি ট্রাফিক স্টপেজে ১৭ বছরের এক কিশোরকে নির্মমভাবে গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনায় বিষয়টি আবার মনে পড়ল।

কী আছে কামুর আউটসাইডারে? ‘মাসরো’ উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। উত্তম পুরুষের জবানিতে লেখা এই উপন্যাসে লেখক মাসরোর মাধ্যমে চারপাশের জগৎ এবং তার গতিময়তা দেখিয়েছেন। মাসরোর আশপাশের প্রতিটি দৃশ্যের খুঁটিনাটি বর্ণনা বইটিকে বুঝতে আরও সহজ করেছে। উপন্যাসের শুরু হয় মাসরোর মায়ের মৃত্যুর খবরের মধ্য দিয়ে।

উপন্যাসের শুরুর অংশই বুঝিয়ে দেয় ব্যক্তি হিসেবে মাসরো কতটা বিকারহীন আর নির্লিপ্ত। তার মা ছিলেন বৃদ্ধাশ্রমে এবং সে ব্যাপারে তার কোনো অনুতপ্ত ভাব ছিল না। মায়ের মৃত্যুতে চোখের পানি না ফেলা, মৃত মায়ের মুখ দেখতে না চাওয়া এমনকি আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই কফি খাওয়া ও ধূমপান যেন মাসরোকে করে তুলেছে অন্য সবার চেয়ে আলাদা। পরে, ন্যূনতম শোক পালন না করে প্রেমিকা মারির সঙ্গে হাসির সিনেমা দেখা, সময় কাটানো কিংবা অন্যান্য প্রাত্যহিক কাজে থাকা মাসরোর চরিত্রে এনেছে ভিন্নতা। তবে গল্পের প্রথম ভাগে এই ভিন্নতার পরিণতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। গল্পের পটভূমি পুরোপুরি বদলে যায় দ্বিতীয় ভাগের মাধ্যমে, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘টুইস্ট’।

মূলত উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগই মাসরোকে সত্যিকার অর্থেই আউটসাইডার হতে সাহায্য করেছে। এক ছুটির দুপুরে সমুদ্রের পারে কাকতালীয়ভাবে মাসরোর গুলিতে খুন হয় এক ‘আরব’ যুবক। এরপর থানা, পুলিশ, কাঠগড়া আর জেলের একঘেয়ে সময় নামক শাস্তি। মাসরোকে তার পক্ষের উকিল নিযুক্ত করতে বলা হলে সে তাতে আপত্তি জানায়। পরে তার পক্ষে একজন সরকারি উকিল নিযুক্ত করা হয় কিন্তু উকিলের শিখিয়ে দেওয়া কোনো কথাই মাসরো বলে উঠতে পারে না। খুনের তদন্তে তার খুনের অপরাধকে ছাপিয়ে গেছে তার মায়ের মৃত্যুতে শোকাহত না হওয়ার অপরাধ। এই অপরাধ দিয়েই মাসরোকে পুরো আদালত, তার চারপাশের মানুষ বিচার করতে লাগল। যার ফলস্বরূপ তাকে জনসমক্ষে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়।

মাসরোর বয়ানে উপন্যাসটি থাকলেও এটি কামুর কলমই লিখেছে। যা সামনে নিয়ে এসেছে আলজেরীয়দের প্রতি ফরাসি জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে। উপন্যাসটির গতিপথ তৈরিতে বা নায়কের ভাগ্য নির্ধারণে সুস্পষ্ট বিষয়টি হচ্ছে– মাসরো এক ‘আরব’কে হত্যা করেছে। এখানে ফরাসি নায়ক, তার বন্ধুবান্ধব সবার নাম আছে কেবল যিনি খুন হলেন, তার নাম নেই, তিনি কেবল ‘আরব’। খুন হওয়া আরবের নাম না থাকা কি মারসোর বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন, আগ্রহ না থাকা, তার ব্যক্তিত্বের শীতলতা নাকি ফরাসি রাষ্ট্রের বিচার-বিবেচনার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা? আর খুনের বিচারটি যেভাবে কার্যকর করা হয় তাতে ‘আরব’ লোকটিকে নামহীনই কেবল রাখা হয় না, তাকে অমানবিক বা ঊনমানুষ হিসেবেও দেখানোর প্রয়াস খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। আরও আশ্চর্যজনক, ফরাসি সমাজ সমুদ্র সৈকতে খুন হওয়া ব্যক্তির চেয়ে মায়ের অ‡ন্ত¨ষ্টিক্রিয়ায় মাসরোর নির্লিপ্ততা ও ভাবলেশহীনতার ওপরই মনোনিবেশ করে বা উদাসীন থাকার নিষ্ঠুরতা দেখায়। উপন্যাসটি কি এই সামাজিক অন্যায়কে তুলে ধরে না? আজকের দিনে এমন উপন্যাসও কি লেখা হতে পারে, যেখানে শুধুমাত্র ইউরোপীয়দের নাম উল্লিখিত থাকবে, আর বাকি সব চরিত্র কেবল আরব বা এশীয় বা আফ্রিকান? কিন্তু সেভাবেই উপন্যাসটি যদি লেখা হতো, তাহলে কি আমরা ধরে নিতাম না যে ঔপন্যাসিকের মাধ্যমে, মানে অন্যদের নামহীন করে, লেখক একটা বার্তা দিচ্ছেন। কামু কি সেই চেষ্টাই করেছিলেন? অভিবাসীদের নিয়ে পশ্চিমে বিশেষত আলজেরীয় বংশোদ্ভূতদের নিয়ে ফ্রান্সের গভীর সমস্যা তুলে ধরতেই কি কামু তার আউটসাইডারে খুন হওয়া আরবকে নামহীন রেখেছেন?

এবার সাম্প্রতিক ঘটনাটির দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। দিনেদুপুরে ট্রাফিক স্টপেজে ১৭ বছরের কিশোরকে গুলি করে খুনের ঘটনায় পুলিশ প্রথমে মিথ্যা বলেছিল। পুলিশ বলেছিল, ওই কিশোরকে থামতে বলার পরও সে পালানোর চেষ্টা করেছিল, তাই পুলিশ গুলি করেছে। ফরাসি জাতীয় সংবাদমাধ্যম পুলিশের বানোয়াট বক্তব্যকে তথ্য হিসেবে প্রচার করেছে। কিন্তু পরে একজন পথচারী তার মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে আসল সত্যকে দেখিয়ে দেন। নাহেল নামের যে ফরাসি তরুণকে পুলিশের গুলিতে দুঃখজনকভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে, সে আলজেরীয় বংশোদ্ভূত।

ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক বর্ণবাদের ও ‘অ-শ্বেতাঙ্গ’ লোকদের ওপর সহিংসতা চালানোর দীর্ঘ ও জঘন্য ইতিহাস রয়েছে। ফ্রান্স, বিশেষ করে আলজেরিয়ার জনগণের ওপর নির্মম নিপীড়ন চালিয়েছে। সেখানে ফরাসি উপনিবেশের গোড়াপত্তন হয় ১৮০০ সালের দিকে। ওই সময় আলজেরিয়ায় ফরাসি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ফরাসিরা ব্যাপক গণহত্যা চালায়। আলজেরিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় (১৯৫৪-৬২) ফরাসি শাসকরা ‘স্বাধীনতা’ ‘সাম্য’ ও ‘ভ্রাতৃত্ব’-এর দোহাই দিয়ে মূলত তাদের ঔপনিবেশিক শাসন জারি রাখতে গণহত্যা চালিয়েছিল। ওই সময় ফরাসি সেনারা ১০ লাখের বেশি আলজেরীয় মানুষকে হত্যা করে এবং অগণিত মানুষের ওপর পরিকল্পিতভাবে অত্যাচার চালায়। তখন থেকেই ফরাসিদের মধ্যে আলজেরীয় বিদ্বেষ রয়ে গেছে।

ঔপনিবেশিক বর্ণবাদ ও পুলিশিংয়ের যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নঁ তেরে এলাকায় নাহেলের হত্যাকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা শ্বেতাঙ্গ ফরাসি রাজনীতিক ও মিডিয়া পণ্ডিতদের আলোচনায় একেবারে অনুপস্থিত থেকে যায়। ফ্রান্সে ক্রমবর্ধমানভাবে কৃষ্ণাঙ্গ ও আরবরা পুলিশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার সরকার নিয়মিতভাবে এবং আক্রমণাত্মকভাবে এসব নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে থাকে। এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটে এবং সেখানে সাধারণত উদারপন্থী ও বামপন্থীদের অনেকেই ওই ঘটনার জন্য পরিকল্পিত বর্ণবাদকে দায়ী করে থাকেন। কিন্তু ফ্রান্সের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফরাসি বর্ণবাদের কথা অস্বীকারের ক্ষেত্রে উদারপন্থী ও বামপন্থীরা উগ্র ডানপন্থীদের সঙ্গে এক হয়ে যান।

যেমনটা ঘটে আউটসাইডার উপন্যাসে খুন হওয়া ব্যক্তিকে নামহীন ‘আরব’ রাখার মধ্যে। যেমনটা দেখা যায় মাসরোর বিচ্ছিন্নতা আর মাতৃবিয়োগে যথেষ্ট শোকাতুর না হতে পারার ব্যাখ্যায় অ্যাবসার্ডিটির বয়ান হাজির করার মানসিকতায়। এমনটি আলজেরিয়া প্রসঙ্গে জটিল অবস্থানে থাকা কামুর মৃত্যুর পর প্রকাশিত তার ‘আলজেরিয়ান ক্রনিকলস’ নিয়ে ফরাসি সমাজের নীরবতাও দেশটির এই বুদ্ধিবৃত্তিক শঠতাকে সামনে নিয়ে আসে। ফলে বিনা কারণে পুলিশের গুলিতে নাহেলের মৃত্যুর ঘটনা ফরাসি সমাজের অন্তর্গত গভীর সমস্যাকেই সামনে নিয়ে আসে। আর এ ধরনের ঘটনা যেহেতু কম নয়, তাই নাহেলও আউটসাইডার উপন্যাসে খুন হওয়া ‘আরব’ ব্যক্তিটির মতো নামহীন সত্তা হয়ে যেতে পারে। যে শুধুই একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে। নাহেল বা তার মতো অভিবাসনের মধ্য দিয়ে আসা ব্যক্তিরা কি ফরাসি দেশে ইনসাইডার, নাকি আউটসাইডার?

লেখক: কবি ও সাংবাদিক