ইসির ক্ষমতা কমিয়ে সংশোধিত আরপিও বিল পাস

বিরোধী দলের আপত্তি ও কঠোর সমালোচনা উপেক্ষা করে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধনী বিল। গতকাল মঙ্গলবার বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক। তবে বিলটি পাসে আপত্তি জানান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, গণফোরাম ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। বিলটি তারা জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। তাদের প্রস্তাব অবশ্য কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

সংসদে পাস হওয়া নির্বাচনী আইনটিতে প্রস্তাবিত সংশোধনে ৯১(ক) অনুচ্ছেদে একটি উপধারা যুক্ত করা হয়েছে। আগে বিলের ৯১(এ) ধারায় ছিল, নির্বাচন কমিশন যদি সন্তুষ্ট হয়, নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন এবং চাপ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিরাজমান অপকর্মের কারণে যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সংগত এবং আইনানুগভাবে নির্বাচন পরিচালনা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না, তাহলে যেকোনো ভোটকেন্দ্র বা ক্ষেত্রমত সম্পূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে ভোটগ্রহণসহ নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে। এর সঙ্গে যুক্ত করে নতুন উপধারায় বলা হয়েছে, শুধু কয়েকটি কেন্দ্রের গোলযোগ-জবরদস্তির জন্য পুরো আসনের ভোট বন্ধ করা যাবে না। সেসব কেন্দ্রের ভোটই বন্ধ করা যাবে, যেসব কেন্দ্রের ভোটগ্রহণে অভিযোগ নেই, তা স্থগিত করা যাবে না। এতে ইসির ক্ষমতা খর্ব হয়েছে বলে বিরোধী দলের সদস্যরা দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এ সংশোধনীর মাধ্যমে ইসির নির্বাচন বন্ধের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

বিলটি পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, ‘বিলটি পাসের মাধ্যমে ইসি পুরো নির্বাচনী এলাকা বন্ধ করতে পারবে না, এমন বিধান করা হচ্ছে। বিলটি পাস হলে শুধু কেন্দ্রগুলো যেখানে গণ্ডগোল হয়েছে, সেখানে বন্ধ করতে পারবে। এটা ইসির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। কারণ ইসি যদি মনে করে কোনো আসনে অনেক গণ্ডগোল হবে, পরিবেশ খারাপ আছে, তাহলে তারা সেখানে নির্বাচন বন্ধ করতে পারবে। গত ৫২ বছর সেটাই চলে আসছে। এখন নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করে কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে? সরকারের আজ্ঞাবহ এ কমিশনের অধীনে কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে ঋণখেলাপি মনোনয়ন জমা দেওয়ার সাত দিন আগে ঋণ পরিশোধের বিধান ছিল। এখন সেটা এক দিন আগে করার মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিপন্থী।’

এ আলোচনায় অংশ নিয়ে গণফোরামের মোকাব্বির খান বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আরপিও সংশোধনের বিলটি আনা হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য বিলটি আনা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। দেশে আইন করা হয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে। যে কারণে প্রত্যেকটা জাতীয় নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনরা আরপিওর কিছু সংশোধন করে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য আরপিও সংশোধনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। বর্তমান সরকারের সময় নির্বাচনব্যবস্থা এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে যে, মানুষ নির্বাচনবিমুখ হয়ে পড়েছে। মানুষ আজ ভোটকেন্দ্রে যেতে চায় না। অবশ্য এর জন্য যারা আজকে সরকার উৎখাতের আন্দোলন করছে, তারা কম দায়ী নয়। তাদের সময়ও তারা ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার করেছিল। তারই ফলে একপর্যায়ে ওয়ান ইলেভেনের সৃষ্টি হয়েছিল।’

মোকাব্বির আরও বলেন, ‘যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে চান আর যারা ক্ষমতা থেকে একবার বিতাড়িত হয়েছেন, তারা আবার যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের উৎখাত করে ক্ষমতায় দখল করতে চান। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তার ভোটের অধিকার চায়, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। দলীয় প্রশাসন ও দলীয়করণ থেকে অব্যাহতি চায়। তারা ভোট চোরকে চায় না, ভোট ডাকাতকেও চায় না। সংবিধান অনুযায়ী, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চায় তারা।’

অবশ্য বিরোধী দলের বক্তব্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘জোর-জবরদস্তি, গোলযোগ, সহিংসতায় তদন্ত সাপেক্ষে পুরো নির্বাচনী এলাকার ভোট বন্ধ করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। তবে একটি কেন্দ্রে গ-গোলের কারণে পুরো আসনে নির্বাচন বন্ধে মানুষের অধিকার লঙ্ঘন হয়। তাই বিষয়টি স্পষ্ট করতে আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। যাতে যেসব কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো বন্ধ করতে পারবে। একই আসনের যেখানে সঠিক নির্বাচন হয়েছে, তা বন্ধ করার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়নি। এটাকে ইসির ক্ষমতা খর্ব করা হয়নি, বরং ইসিকে শক্তিশালী করা হয়েছে।’

পাস হওয়া বিলে টিআইএন এবং ট্যাক্স রিটার্ন দাখিলের কপি জমা, প্রার্থিতা বাছাইয়ে বৈধ হলেও তার বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ, দল নিবন্ধনে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুত লক্ষ্যমাত্রা ২০২০ থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করা এবং ভোটের সংবাদ সংগ্রহে থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের কাজে বাধা দিলে কিংবা যন্ত্রপাতি বিনষ্ট করলে শাস্তি-সাজার বিধান রাখা হয়েছে।