বাজেট সহায়তা ও ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া শর্তের কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে ঢাকা এসেছে সংস্থাটির মুদ্রা ও পুঁজিবিষয়ক কারিগরি মিশন। এদলটি দেশে থাকতেই আগামী ১৪ জুলাই আইএমএফের ডিএমডি বো লি-এর দেশে আসার কথা আছে। তিনি আইএমএফের চার উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের একজন। এবারের আলোচনার পরই বাজেট সহায়তা দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় কিস্তির বিষয়েও সিদ্ধান্ত দেওয়া হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব জানা যায়।
গতকাল বুধবার দেশে এসেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা। ঋণ অনুমোদনের আগে সংস্থাটির দেওয়া শর্তের কতটা সরকার বাস্তবায়ন করেছে এবং বাকি শর্তপূরণে অগ্রগতি কতটা আলোচনাকালে তা গুরুত্ব পেয়েছে। গতকালের বৈঠকে ঋণ ও নগদ ব্যবস্থাপনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়। আদর্শ বন্ড ইস্যু, দায় ব্যবস্থাপনা এবং মধ্য মেয়াদে আর্থিক কাঠামো বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ব্যাংক ও আর্থিক খাত, আন্তর্জাতিক রিজার্ভ ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ, সরকারের বাজেট ঘাটতি, করছাড়, সামাজিক ব্যয়, পুঁজিবাজার নিয়েও কথা হয়েছে। বৈঠকে গত অর্থবছরে এনবিআরে রাজস্ব ঘাটতির কারণ নিয়ে অনেকটা সময় কথা হয়। এ ছাড়া চলতি বাজেটে সংস্থাটির শর্তের কী কী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা জানানো হয়েছে।
এবার ঋণ ও বাজেট সহায়তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অরিন্দম রায়ের নেতৃত্বে সংস্থার পাঁচ সদস্যের এই মিশনের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের দুই সদস্যও রয়েছেন। আইএমএফের পুঁজিবিষয়ক এই কারিগরি মিশন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ১৭ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবেন।
চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে সংস্থাটি। ঋণ অনুমোদের আগেই সংস্থাটি সরকারকে জানিয়ে দিয়েছিল নিয়মিত ঋণের কিস্তি পেতে হলে কত দিনে কী কী শর্তপূরণ করতে হবে। সরকার শর্ত মানতে রাজি হওয়ায় ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের তিন দিন পরই প্রথম কিস্তিতে ছাড় করেছে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে সাত কিস্তিতে ঋণের পুরো অর্থ দেওয়ার কথা। বৈশ্বিক মন্দার কারণে আর্থিক সংকটে আছে বাংলাদেশ সরকার। ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পেতে এরই মধ্যে সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাজেট সহায়তা পেতে বিশ^ব্যাংকসহ অন্যান্য ঋণদানকারী সংস্থার সঙ্গেও চলছে যোগাযোগ। এসব সংস্থা থেকেও ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে আইএমএফের দেওয়া শর্ত মানতে ব্যর্থ হলে ঋণের কিস্তি ছাড় করা হবে না এমন কথা আগেই বাংলাদেশ সরকারকে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
ছোট-বড় আকার মিলিয়ে আইএমএফ থেকে এ পর্যন্ত এগারোবার ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালে সাত কিস্তিতে ১০০ কোটি ডলার ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। এর অন্যতম শর্ত ছিল নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়ন করা। এ আইন করতে দেরি করায় শেষের দুই কিস্তি আটকেও দিয়েছিল আইএমএফ।
এরই মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশে সরকারের শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে খানিকটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শর্তের বেশিরভাগই অন্তর্ভুক্তির কথা থাকলেও নির্বাচনের আগের শেষ বাজেট হওয়ায় ভোটার অসন্তোষ্টির ভয়ে সরকারের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। আইএমএফ প্রতিনিধিদের এবারের সফরের বৈঠকে শর্ত মানার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে বলে জানা গিয়েছে।
এর আগে ঋণ অনুমোদনের প্রায় তিন মাস পর ঋণের শর্তের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার জন্য গত এপ্রিলের শেষে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসে। গত ২৫ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিনিধিদল।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঋণের কিস্তি ছাড়ের আগে আইএমএফ প্রতিনিধিরা মূল্যায়ন করে থাকেন যে কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বাকিটা বাস্তবায়নে অগ্রগতি কতটা। কয়েকটা খাতে শর্তপূরণ হবে না বলে এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশেষভাবে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা, রিজার্ভ, উন্নয়ন বাজেট বিষয়ের শর্তপূরণ কঠিন হবে। এতে যে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় করা হবে না এমনটা মনে করছি না।
আইএমএফের ডিএমডি বো লি ২৪ ঘণ্টার জন্য ঢাকায় অবস্থান করতে পারেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। চীনা বংশোদ্ভূত এই ডিএমডির সঙ্গে আইএমএফের আরও কয়েকজনের থাকার কথা রয়েছে।
সূত্র জানায়, ডিএমডি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই ব্যবস্থা, সবুজ অর্থায়ন ইত্যাদি বিষয়ে একটি সেমিনারে অংশ নেবেন। তার এ সফরে সরকারের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গেও বৈঠকের কথা রয়েছে। সংস্থাটির দেওয়া শর্ত বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলেও তাকে জানানো হবে। ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে তা ইতিবাচক মতামত পেতে চেষ্টা চালানো হবে।