মশাবাহিত রোগ নিয়ে চিন্তা বেড়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের। চলতি বছর রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রামেও মশাবাহিত নানান রোগের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপ চোখে পড়ার মতো। ঢাকায় আক্রান্তের পাশাপাশি মৃতের সংখ্যাও অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছর ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগেভাগে সতর্ক হয়ে চসিকসহ সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়ার কথা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. মো. ইলিয়াছ।
সিভিল সার্জন জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত মশাবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫৭৯ জন রোগী নগরের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই ভর্তি হয়েছে ২৮২ জন। অথচ এর আগের বছর জুন মাসে রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল মাত্র ১৯ জন। গত সোমবার পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৮৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। গত ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০ জন। এর মধ্যে গেল জুন মাসে মারা গেছেন তিনজন।
এক প্রশ্নের উত্তরে সিভিল সার্জন ডা. মো. ইলিয়াছ বলেন, ‘বর্ষা আসার আগেই আমরা ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে সতর্ক করেছিলাম। অনেকের ধারণা, এডিস মশা জন্মায় নালা-নর্দমার পানিতে। প্রকৃতপক্ষে এডিস মশা জন্মায় পরিষ্কার পানিতে। শহরে শত শত ভবন গড়ে উঠছে। এসব গড়ে তোলার জন্য যেসব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয় সেসবেও পানি জমে। আর এসব পানি থেকে এডিস মশা জন্মায়।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয়জন রোগী ভর্তির তথ্য জানিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলেন, ‘বর্তমানে চমেকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২৮ জন রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে ছয়জন শিশু। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে।’
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক সাবেক সিভিল সার্জন ডা. ফজলে রাব্বি বলেন, ‘এই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গড়ে ১০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের বিকল্প নেই। থানা এবং আদালত ভবনে মামলার আলামত হিসেবে রাখা বিভিন্ন গাড়ির যন্ত্রাংশ ও টায়ার থেকেও এডিস মশা জন্মাচ্ছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক না হলে কোনো ক্রাশ প্রোগ্রাম কাজে আসবে না।’
জানা গেছে, নগরের ১৬ থানায় মামলার আলামত হিসেবে পড়ে আছে শত শত গাড়ি। পাশাপাশি সিএমপির চারটি ট্রাফিক বিভাগের ড্রাম্পিং স্টেশনেও পড়ে আছে আটক করা বিপুল পরিমাণ গাড়ি। এসব আলামত বৃষ্টির পানিতে ভিজছে আর রোদে পুড়ছে। গাড়ির টায়ার বা যন্ত্রাংশে পানি জমে থাকে অনেক দিন। ফলে সেগুলো থেকে এডিস মশা জন্মাচ্ছে।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আ স ম মাহতাব উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানায় মামলার আলামত রাখার জন্য আলাদা জায়গা দরকার। বৃষ্টিতে ভিজে এবং রোদে পুড়ে এসব আলামত নষ্ট হচ্ছে। এখন বৃষ্টির মৌসুম গাড়ির যন্ত্রাংশ বা টায়ারে পানি জমে এডিস মশা উৎপন্ন হচ্ছে। তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ যখন মশার ওষুধ স্প্রে করে তখন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দ্বারা স্প্রে করা হয়।’
চসিক সূত্রের খবর, শুধু থানাই নয়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় পরিত্যক্ত গাড়ি বছরের পর বছর পড়ে থাকায় সেগুলোও মশার বংশবিস্তারের জায়গা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চসিকের তরফ থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সচেতন হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নগরের স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, শহরের অনেক জায়গায় ভবনের নির্মাণসামগ্রী, থানা চত্বরে, ট্রাফিক পুলিশের ডাম্পিং স্টেশন এবং রাস্তার পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। কিন্তু এসব গাড়ি সরানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা আবুল হাশেম জানান, গত ২৩ জুন থেকে মশক নিধনে নগরের ৪১ ওয়ার্ডে ১০০ দিনের ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে নগরে অর্ধশতাধিক হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দামপাড়া পুলিশ লাইনস নালা, বাকলিয়া থানাধীন কল্পলোক আবাসিক, চকবাজার বাদুরতলা এবং চাক্তাই খাল। মশক নিধনের জন্য এবার বিমানবাহিনী থেকে কার্যকর ওষুধ কেনা হয়েছে বলে জানিয়ে চসিকের এই কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি নগরের পোস্তারপাড়, ডিটি রোডে কিছু টায়ারের গুদামে অভিযান চালানো হয়েছে।
জানা গেছে, পরিত্যক্ত গাড়ির পাশাপাশি টায়ার, ভবনের ছাদে ফুলের টব, মাটির ভাঁড়, ডাবের খোলস ইত্যাদি বিষয়ের ওপরেও নজর দিচ্ছে চসিক। চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা আবুল হাশেম জানান, নগরবাসীর কাছে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে আবেদন জানানো হচ্ছে। কোনোভাবেই কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে তাদের। নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করতে চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মীদেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা সাফাইয়ের পাশাপাশি মশক নিধনে ১০০ দিনের কাজের কর্মীদের ওয়ার্ডভিত্তিক মোতায়েন করা হয়েছে।
সূত্রটি জানায়, নগরের অনেক পরিত্যক্ত বিপজ্জনক বাড়ি রয়েছে। এসব বাড়িও মশার বংশবৃদ্ধির জায়গা। সেখানে মশার লার্ভা ধ্বংসকারী স্প্রে ছিটানো হচ্ছে। প্রাণঘাতী ডেঙ্গু রোগের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতিটি ওয়ার্ডে মশাবাহিত রোগ ঠেকাতে সচেতনতামূলক অভিযানে নেমেছে চসিক।