বিশ্বের অন্তত ৩৫০ কোটি মানুষের প্রধান খাবার ভাত। কিন্তু চালের বাজারে জলবায়ুর ধাক্কা আভাস দিচ্ছে সংকটের। চাল উৎপাদনের জন্য নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া ও মৌসুমি বৃষ্টিপাত অপরিহার্য। প্রতি বছর বিশ্বে যে পরিমাণ চালের উৎপাদন হয়, তার ৯০ ভাগই হয় এশিয়ার বৃষ্টিবহুল অঞ্চলগুলোতে। কিন্তু কয়েক বছর এই বৃষ্টিপাত আশানুরূপ হচ্ছে না। জলবায়ুগত কারণে উৎপাদন কমায় চালের দাম গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে চালের দাম পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জন্য শঙ্কা জাগানো এ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম এই মুহূর্তে চাল উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষে থাকা দেশ। কিন্তু এল নিনো ধাঁচের আবহাওয়া, অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টিপাত, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খরাসহ বিভিন্ন কারণে গত বছর চালের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। বাজারে বর্তমানে চালের যে দাম, তা ইতিমধ্যে গত ১১ বছরের রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বাজারবিষয়ক সূচক বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি জুলাই মাসে চালের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ। গত মাসে এই মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৭ শতাংশ। বিশ্বের প্রধান চাল উৎপাদনকারী ভারত, চীনের মতো প্রায় সবগুলো দেশেই চালের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমতে দেখা যাচ্ছে। এজন্য জলবায়ুগত বিষয় ‘এল নিনো’র প্রভাবকে মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। চীনের আবহাওয়া প্রশাসন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, মারাত্মক এল নিনোর প্রভাবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশটির দক্ষিণ অঞ্চলে বন্যা ও উত্তরে খরার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রার চেয়ে মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগর বেশি উষ্ণ হয়ে আছে। সবশেষ ২০১৮-১৯ সালে এ ধরনের এল নিনো পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। গড়ে তিন থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো পরিস্থিতি হয়। পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ থাকে, তখন তাকে এল নিনো বলা হয়। আর এর বিপরীত অবস্থার নাম ‘লা নিনা’। পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তখন তাকে লা নিনা বলা হয়।
জলবায়ুবিজ্ঞানী মিশেল এল হুরু বার্তা সংস্থাকে জানান, এল নিনো কতটা শক্তিশালী, তার ভিত্তিতে পরিবেশের ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। যেমন বিশ্বজুড়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টি কিংবা খরার ঝুঁকি বেড়ে যায়। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিজিটিএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ুগত সংকটের কারণে চীনে এবার গত ২০ বছরের মধ্যে চালের উৎপাদন হয়েছে সর্বনিম্ন।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চাল উৎপাদন ও রপ্তানিকারী দেশ ভারতেও একই চিত্র। দেশটির চাল রপ্তানিকারকদের সংগঠন রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আরইএ) প্রেসিডেন্ট বি ভি কৃষ্ণ রাও রয়টার্সকে বলেন, ‘ভারত বরাবরই সবচেয়ে কম দামে চাল রপ্তানি করে। কিন্তু গত প্রায় দেড় বছর ধরে চাল উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোতে বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। ফলে চালের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’ দিল্লিভিত্তিক বাজার-বিশ্লেষক সংস্থা গ্লোবাল ট্রেডিং হাউজের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বৈরী আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বিগত বছরগুলোর তুলনায় দেশটিতে গত বছর ২৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে গ্রীষ্মকালীন চালের উৎপাদন। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক থাইল্যান্ডেও গত বছর চালের উৎপাদন ২৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই কারণে চতুর্থ বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনামেও চালের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। সংকট সামাল দিতে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশÑ চীন ও ভারত চালের রপ্তানিতে লাগাম টানছে। তাদের অনুসরণ করছে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন।
রয়টার্স বলছে, চলতি বছর মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান এবং ভিয়েতনাম থেকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন চাল বিশ্ববাজারে আসতে পারে। কিন্তু বড় দুই জোগানদাতা ভারত ও চীন যদি বাজারে চাল না ছাড়ে তাহলে দাম সহনীয় নাও হতে পারে।