ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব

নির্বাচনকেন্দ্রিক সফর নয় মার্কিন প্রতিনিধিদলের

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে ওয়াশিংটনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের আসন্ন বাংলাদেশ সফর নির্বাচনকেন্দ্রিক নয় বলে দাবি করেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ দাবি করেন তিনি।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল নির্বাচনের জন্য আসছে এ তথ্য আমাদের মধ্যে নেই। তারা আসছে, এখানে তাদের সঙ্গে অনেক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। অনেক বিষয়ের মধ্যে হয়তো নির্বাচনের বিষয়টি আসতে পারে। তবে এটা ঠিক যে, এ সফরটি নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়।

১১ থেকে ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নাগরিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া ঢাকা সফর করবেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য হিসেবে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার এশিয়া দপ্তরের উপসহকারী প্রশাসক অঞ্জলী কৌর।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের এ সফর সম্পর্কে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমেরিকার সঙ্গে আমাদের অনেক মেকানিজম কাজ করছে। এর মধ্যে লেবার ও ট্রেড ইস্যু রয়েছে। আবার তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনেও যাবে।

৮-২৩ জুলাই ঢাকা সফর করবে ইইউ প্রতিনিধিদল : পররাষ্ট্র সচিব বলেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদল ৮ জুলাই ঢাকা আসছে। প্রতিনিধিদল ২৩ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবে। তাদের সফরে ঠিক হবে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক আসবে কি না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘অনুসন্ধানী অগ্রগামী দল’ ৮-২৩ জুলাই বাংলাদেশ সফর করবে। এ মিশনের কাজ হবে মূলত নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের কর্মপরিধি, পরিকল্পনা, বাজেট, লজিস্টিক ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় মূল্যায়ন করা। অনুসন্ধানী মিশন বাংলাদেশে অবস্থানকালে সরকারের প্রতিনিধি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবে। অনুসন্ধানী মিশন থেকে প্রাপ্ত এসব তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলাপ অমূলক : বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) ইস্যুতে আলোচনা করতে গতকাল সকালে ঢাকায় এসেছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) সৌরভ কুমার। এদিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সৌরভ কুমারের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র সচিব।

মার্কিন প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের এ সফরের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, এর সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফরের কোনো সম্পর্ক নেই। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সফরে নির্বাচনের বিষয় নিয়ে আলাপের কথা অমূলক।

বলা হচ্ছে বিমসটেক ইস্যুতে আলোচনা করতেই ভারতের পররাষ্ট্র-সচিব (পূর্ব) ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু তার সফরের সময়ে বিমসটেকের সেক্রেটারি জেনারেল ঢাকায় নেই। তাহলে কি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়েই ভারতের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এমন প্রশ্নে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, এগুলো একেবারে অমূলক। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্পেকুলেশন দেখেছি। এটা ঠিক নয়। বিমসটেকের সেক্রেটারি জেনারেলের মা মারা গেছেন। সে কারণেই তিনি নেই। এখানে অন্য কিছু নেই।

সৌরভ কুমারের সফরের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফরের কোনো সম্পর্কই নেই জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এসব দিন আগেই অর্গানাইজ করা হয়েছে। তাই ভারতের সচিব এলেন, তার সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদল আসছে এটাকে একটা সম্পর্ক করা এটা ঠিক নয়। একটা দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিরিজ অব সফর বা মিটিং হয়। বরং আমাদের কমই হয়।

তিনি বলেন, একই সময়ে তিন-চারটি মিশন আসছে, এর মানে এই নয় যে, প্রতিটি ডেলিগেশন অর্গানাইজ করে বা কো-অর্ডিনেট করে করছে। সুতরাং এখানে এত এডিট করার কিছু নেই, প্রতিটির আলাদা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে।

১০৬২ জনকে সুদান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম ব্রিফিংয়ে বলেন, ১ হাজার ৬২ জন বাংলাদেশের নাগরিককে সুদান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, সুদানের সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনীর মধ্যে ১৫ এপ্রিল থেকে সংঘর্ষ চলমান। এ পর্যন্ত প্রায় ছয় শতাধিক মানুষ সেখানে নিহত হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৯০৩ বাংলাদেশিকে গত মে মাসে সরকারি খরচে সুদান থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ৮০, ২ জুলাই আরেকটি ফ্লাইটে ৫৯ ও ৩ জুলাই আরও ২০ বাংলাদেশি দেশে আসেন।

রফিকুল আলম বলেন, সুদানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বদর এয়ারলাইনসে সরকারি খরচে সুদান থেকে দোহায় পরিবহন করা হচ্ছে। দোহা পৌঁছামাত্র তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ফ্লাইটে বোর্ডিং করিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যাবাসিত প্রত্যেককেই দেশে ফেরার পর পকেটমানি হিসেবে ৫ হাজার টাকা ও খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পোর্ট সুদান বা দোহা কোনো স্থানেই যেন প্রবাসীদের কোনো অসুবিধা না হয়, সেজন্য উভয় স্থানেই প্রবাসীদের জন্য খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা ও সাময়িক বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আটকেপড়া সব বাংলাদেশিকে নিরাপদে আমরা দেশে ফিরিয়ে আনতে পারব বলে বিশ্বাস।

মালি থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত : ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গত ৩০ জুন একটি প্রস্তাব পাস হয়। ওই প্রস্তাবের মাধ্যমে কার্যত মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ম্যান্ডেট বাতিল ও মালি মিশন থেকে সব শান্তিরক্ষী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব শান্তিরক্ষীকে মালি থেকে প্রত্যাহার করা হবে। এ বিষয়ে মালি সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। সচিব বলেন, মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন বন্ধের মূল কারণ হলো মালি সরকারের অসম্মতি।

তিনি বলেন, গত জুনে মালির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তিরক্ষীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান। স্বাগতিক দেশের সম্মতি ছাড়া শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা অসম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। একই মন্তব্য করেন নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিও।

২০১৩ সাল থেকে এ শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরু থেকেই বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা মালিতে শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্বরত আছেন। বর্তমানে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী মালি মিশনে দায়িত্বে নিয়োজিত।

বাংলাদেশ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি দেশের শান্তিরক্ষী মালি শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করছে। গৃহীত রেজল্যুশন অনুযায়ী, মালি মিশনে দায়িত্বরত সব শান্তিরক্ষীকে প্রত্যাহার করা হবে। জাতিসংঘের ম্যান্ডেটের অধীন ভবিষ্যতে যেকোনো শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি সবসময় রয়েছে।

এ ছাড়া পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে আগামী ৩০ নভেম্বর থাইল্যান্ড যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ বিমসটেকের পরবর্তী চেয়ারম্যান এবং ভারত মহাসচিবের দায়িত্ব নেবে। ১৭ জুলাই বিমসটেকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হবে।