কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খুনোখুনি বেড়েছে। এ ছাড়া আছে মাদক কারবার, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধ কর্মকা-। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলির উখিয়া ক্যাম্প সফরের সময় ও তার পরদিন দুটি ঘটনায় ৭ জন নিহত হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও শরণার্থী বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বদরবারে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে প্রত্যাবাসন পেছাতেই পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পগুলোতে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে একটি মহল। যখন কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা ক্যাম্প সফরে আসেন তখনই এমন ঘটনা ঘটে। সশস্ত্র দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন দেখে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব ঘটনার পেছনে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের ইন্ধন ও সহযোগিতা রয়েছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের মুখে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি ক্যাম্পে। তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের সহায়তায় মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দেনদরবার চলছে। প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকাও তৈরি হয়েছে। প্রত্যাবাসনের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান রয়েছে রোহিঙ্গাদের।
গত বৃহস্পতিবার আইসিসির প্রধান কৌঁসুলির সফরের দিন উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা নেতাকে (সাব মাঝি) হত্যা করা হয়। তিনি প্রত্যাবাসনের পক্ষে ছিলেন বলে জানা গেছে। পরদিন শুক্রবার বালুখালী ক্যাম্পে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে ৬ জন নিহত হয়েছে। রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ইয়াবা, আইস ও স্বর্ণ এবং অস্ত্র কারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। মাদক ও অস্ত্রের কারবার নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পগুলোতে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় শতাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এসব বাহিনী ক্যাম্পে নিজেদের আধিপত্য জিইয়ে রেখে প্রত্যাবাসন রুখে দিতে ইয়াবা ও আইস বিক্রির টাকায় অস্ত্র কিনছে।
ক্যাম্পে আশ্রিত সাধারণ রোহিঙ্গাদের দেওয়া তথ্যমতে, রাত হলেই বসে মাদকের হাট, সরকারি-বেসরকারি দাতা সংস্থার কর্মীরা ক্যাম্প ত্যাগ করলেই বাড়তে থাকে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা। শুরু হয় ভীতি প্রদর্শন, রাত বাড়লেই চলে অস্ত্রের মহড়া।
এ বিষয়ে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প ৭-এর ব্লক সি-এর নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব সন্ত্রাসী এখানে খুনখারাবি করে, অস্ত্র নিয়ে ঘুরে ভয়ভীতি দেখায়Ñ তাদের দিনের বেলায় ক্যাম্পে দেখা যায় না। তাদের কাছে থাকা অস্ত্রগুলো অত্যাধুনিক।
গোয়েন্দা সূত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা নেতাদের তথ্যমতে, ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আরসা, আরএসও, আল সাবা, আল ইয়াকিনও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্পভিত্তিক উগ্রবাদী অধিকাংশ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিদের যোগাযোগ রয়েছে। ক্যাম্প অশান্ত করার জন্য সন্ত্রাসী গ্রুপকে বিনামূল্যে ইয়াবা দিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। তারা আরসাকে মদদ দিচ্ছে।
কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে বসবাসকারী রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যখন কোনো দাতা সংস্থার বড় কর্মকর্তা, বিদেশি রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘ কিংবা বাংলাদেশের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্যাম্পে আসেন তার আগে-পরে অস্থির হয়ে ওঠে ক্যাম্প। আসলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা একটি গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের বিশ্বদরবারে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণ করতে চাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। তারাই বারবার নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নামে একই ঘটনা ঘটায়। এর পেছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের হাত রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে। এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) দুটি ইউনিটের প্রায় ১৪০০ সদস্য কাজ করে। রোহিঙ্গাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য শতাধিক ওয়াচ টাওয়ার এবং প্রায় ৯০০ ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরা রয়েছে। তার মধ্যে ২৪০টির মতো ক্যামেরা চুরি গেছে। এছাড়া দিনের অধিকাংশ সময় এগুলো বিদ্যুতের অভাবে অকেজো থাকে।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাম্প প্রশাসনের (এপিবিএন) খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে সমস্যা বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাফেরা, ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও কাজের সুবিধা বন্ধ না করে দিলে একদিন পুরো উখিয়ায়ই মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হবে। তিনি বলেন, ইয়াবা, অস্ত্র ও আইস তো ক্যাম্পে তৈরি হয় না। মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। যদি এপিবিএন কঠোরভাবে রোহিঙ্গাদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে অপরাধ অনেকাংশে কমে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রত্যাবাসন রুখতে একটি বিদেশি শক্তি কাজ করছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ওই শক্তিটিই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে লোভ দেখিয়ে কতিপয় রোহিঙ্গার মাধ্যমে ক্যাম্পে নানা অপরাধমূলক কর্মকা- ঘটাচ্ছে।
তবে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) সৈয়দ হারুনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আধিপত্য বিস্তার, ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণ, বাজার থেকে চাঁদাবাজিসহ আরও কয়েকটি কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুনাখুনি হয়। বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা বাদ দিলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো শান্ত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা চ্যালেঞ্জের। এদের আমরা চিনি না, জানি না কে সন্ত্রাসী কে ভালো মানুষ, ক্যাম্পগুলোতে তাদের ওপরই আমাদের নির্ভর করতে হয়। তাদের দেওয়া তথ্যেই আমাদের অভিযান চালাতে হয়। তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া খুব জটিল।’
সিসিটিভি চুরির বিষয়টি স্বীকার করে এই এপিবিএন কর্মকর্তা বলেন, ‘ভৌগোলিকভাবে এই ক্যাম্পগুলো ঝুঁকিপূর্ণ, এখান থেকে বের হওয়ার ও ঢোকার অনেক পথ রয়েছে যেগুলো অরক্ষিত।’
‘রোহিঙ্গা : নিঃসঙ্গ নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী’ বইয়ের লেখক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, খালি চোখে দেখলে মনে হবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে। আসলে মোটেও তা নয়। ঘটনার সময়, স্থান ও অস্ত্রের ধরন বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা বেশিরভাগ অস্ত্র মিয়ানমার থেকে আসা। আসলে এই জাতিকে বিশ্বদরবারে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত করতে চায় একটি মহল। তারা প্রমাণ করতে চায়, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী বলেই তাদের বিতাড়িত করা হয়েছে। এটা প্রমাণ করার মাধ্যমে তারা প্রত্যাবাসন পেছাতে চায়। তাদের তৈরি ওই ফাঁদে পা দিয়েছে কতিপয় লোভী রোহিঙ্গা।