আন্দোলন নিয়ে দ্বিধা অসন্তোষ বামজোটে

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের অধীনে হবে কী হবে না, এ বিতর্ক দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক দিন ধরে আছে। শেষ পর্যন্ত কীসে ফয়সালা হবেÑ বর্তমান সরকারের অধীনে নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নাকি আমূল সংস্কারকৃত কোনো সরকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার অধীনে, সেজন্য আসন্ন সময়ই নির্ণায়ক এবং সূচক।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে এক দফা আন্দোলনের কর্র্মসূচি ঠিক করেছে। আর বামজোটভুক্ত দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার সরাসরি না চাইলেও নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রভৃতি দাবিতে আন্দোলন করছে।

বামজোটের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে আন্দোলনের কথা বলা হলেও কার্যকরী কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চোখে পড়ে না। দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন সমাবেশ ও মিছিলে আবদ্ধ তাদের দাবি। বামজোটের নির্বাচনমুখী তৎপরতায়ও অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মনে করে নেতাকর্মীরা। এতে জোটে দ্বিধাবিভক্তি বাড়ছে, কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হচ্ছে। তৃণমূল কর্মীদের দাবি, নির্বাচন বিষয়ে জোটের বক্তব্য ও আন্দোলন-কৌশল স্পষ্ট হওয়া উচিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বামজোটের এক নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক নিয়ম পরিবর্তন ও গত দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত অনিয়ম বিদ্যমান বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো ‘শাসক দলের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়’ এ মনোভাবে থাকলেও এখনো নির্বাচনসংক্রান্ত দাবিনামা বা ‘আন্দোলনের রূপরেখা’বিষয়ক ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে না বামজোটে। নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তদারকি সরকার ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের কথা বললেও তাদের এ নিয়ে ধারাবাহিক কোনো কর্মসূচি নেই। বিগত সময়ে বিশেষ করে আটের দশকে সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে ভোটাধিকারের দাবিতে সোচ্চার করতে বাম দলগুলোর যে ভূমিকা ছিল, তা এখন নেই।’

জোটের আরেক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ও তার জোট এবং বিরোধী দল ও তার জোট কীভাবে অংশগ্রহণ করবে, তারা কী ভাবছে সেটা মুখ্য বিষয় থাকে। ক্ষমতাসীনরা একভাবে চিন্তা করছে। বিরোধীরা তাদের মতো ভাবছে। বিএনপির চিন্তা একদিকে দল রক্ষা, অন্যদিকে ক্ষমতায় আসা। অন্যান্য যে ফোর্স তাদের সঙ্গে রয়েছে তারা কীভাবে ক্ষমতার ভাগীদার হবে তা নিয়ে ব্যস্ত। এসবের বাইরে সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বে বামজোট। তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। কেউ কেউ তাদের সঙ্গ ছেড়ে গেছে। বামজোটের নির্বাচনমুখী যে তৎপরতা তাতে দ্বিধার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। সিপিবি-বাসদ একভাবে চিন্তা করছে, অন্যরা আরেকভাবে চিন্তা করছে। এ সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে কী করবে না, এ কথা তারা কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে। এ কথা স্পষ্ট করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘অমুক না এলে আমি যাব নাÑ এ ধরনের সই পাতানোর চিন্তা থেকে বামপন্থিদের বের হয়ে আসতে হবে। বামপন্থিরা যদি আলাদাভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চায় তাহলে এখনই ঘোষণা করা উচিত। আর যদি না করতে চায়, তারা যদি মনে করে সরকার নির্বাচন করতে দেবে না তাহলে স্পষ্ট পজিশন নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো দরকার। কারণ সময়টা নির্বাচনমুখী। এ সময়ে অন্য কোনো আন্দোলন হালে পানি পাবে না। এখন নির্বাচনকেন্দ্রিক ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট বক্তব্য নিয়ে মানুষের কাছে যাওয়া উচিত। নির্বাচন নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত।’

বামজোট বলেছে, ‘এ মাসেই সংস্কার প্রস্তাবসহ আরও নির্দিষ্ট করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আন্দোলনের প্রধান বিষয় হবেÑ ভোট ও ভাতের অধিকার। ইতিমধ্যে বামগণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী বামমোর্চা ও বাংলাদেশ জাসদ যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে। এ আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগির বিভাগীয় ও জেলা শহরে সভা-সমাবেশ হবে। জুলাই মাসের শেষের দিকে রাজধানীতে বড় সমাবেশ করা হবে। সেখান থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

বামজোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘একটা বাদ দিয়ে আরেকটা করলে জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে না। সাধ্য অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। যদিও মানুষ সব এক দফায় বুঝতে চায়। আমরা এ সংগ্রামটা কেন করছি? আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ফেল করেছে। এজন্য নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। সেই নির্বাচন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরী করতে হবে। জাতীয় সংসদে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। ভালো নির্বাচন করতে হলে নির্দলীয় তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। বামপন্থিদের সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়ে মানুষ বা মিডিয়া অনেক ক্ষেত্রে কনফিউজড হয়ে যায়। তারা এক দফাকে সামনে তুলে ধরতে চায়।’

তিনি বলেন, ‘সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি ও সংস্কারের প্রস্তাব ২০০৭-০৮ সালে নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছিলাম। ২০১৭ সালে এ প্রস্তাব রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছিলাম। বিষয়গুলো আমাদের আরও প্রচার করা দরকার ছিল। কিন্তু অনেক ইস্যু সামনে চলে আসে। ফলে এ ইস্যুতে আমরা যথাযথ মনোযোগ দিতে পারিনি। তবে মানুষের মধ্যে এটুকু প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি যে, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা ফেল করেছে। একটা সংস্কার করা ছাড়া ভালো নির্বাচন হবে না।’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘আমাদের প্রধান চাওয়া হচ্ছে এ সরকারের পতন। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার প্রবর্তন, টাকার খেলা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ হওয়া, সাম্প্রদায়িকতা, প্রশাসনিক কারসাজিনির্ভর বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের কথাও বলেছি। সরকারের পতন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বিষয়টা এমন নয়। আগেও চারটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছে। তাতে কি সমস্যার সমাধান হয়েছে? বিএনপিসহ যারা এক দফার দাবিতে আন্দোলন করছে তারা কিন্তু এসব বিষয়ে কথা বলছে না। এ সংকটের সমাধান না হলে জনগণের মুক্তি আসবে না। যারা ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতায় থাকার জন্য আন্দোলন করে তাদের সঙ্গে কি আমরা শামিল হব? আমাদের দাবিগুলোরও ফয়সালা হতে হবে।’

বামজোটের সমন্বয়ক ও বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, আওয়ামী সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব না। নির্বাচনের আগে একটি তদারকি সরকার লাগবে। যেটা দলীয় সরকার হবে না। এ বিষয়ে আমাদের আন্দোলনের ঘাটতি রয়েছে। আমাদের যেভাবে ক্রেজ তৈরি করা উচিত ছিল তাতে আমাদের ব্যর্থতা রয়েছে। আমাদের জোটগত আলোচনা চলছেÑ কীভাবে আন্দোলন গতিশীল করা যায়।’