মামলার জালে আটকে আছে ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের টাকা। এসব টাকা পরিশোধ না করতে গ্রাহকরা বিভিন্ন আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন। এতে বছরের পর বছর আদালতে চলছে মামলা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংক। এজন্য মামলাধীন খেলাপি ঋণ গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে আদায়ে জোর দিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল সোমবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক পর্যালোচনা সভায় মামলাধীন ঋণ নিষ্পত্তিতে এমন পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় করতে প্রতি তিন মাস পর পর এ সভা আয়োজন করা হয়।
সভার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলাধীন ঋণের অগ্রগতি নিয়ে এটা নিয়মিত সভা। মামলাধীন ঋণ কোন পর্যায়ে আছে, নিষ্পত্তি কেন হচ্ছে না, কীভাবে আরও বেগবান করা যায় এবং কীভাবে খেলাপি ঋণ আদায় করা যায় এসব বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের ফলাফল ভালো আসছে। সব ব্যাংক মামলাধীন ঋণ কমানোর জন্য সক্রিয়। অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে আদায় বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ইচ্ছে করলে মামলাধীন ঋণের অর্থ আদায় করতে পারবে না। কারণ আদালতের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। এ ধাপ বা প্রক্রিয়াগুলোকে কীভাবে মনিটরিং করা যায় সে বিষয়ে তাদের বলা হয়েছে। আদালতে মামলা চলছে কিন্তু ব্যাংক ও গ্রাহকদের সম্পর্কের ভিত্তিতে যদি ঋণ আদায় হয়ে যায়, তাহলে সে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। সে চেষ্টা করা হচ্ছে। সেভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আদায়ে জোর দিতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণ আদায়ের জন্য মামলা করা হলেও অর্থঋণ আদালতে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই সময়ক্ষেপণের সুযোগ রয়েছে। এ আদালতে রায় হওয়ার পরও খেলাপি গ্রাহকরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। বছরের পর বছর পার হলেও সেই প্রক্রিয়া শেষ হয় না। এজন্য দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছরই আদালতে মামলা ও এর বিপরীতে আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে অর্থঋণ আদালতে ৭২ হাজার ১৮৯টি বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আটকে আছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। বিচারাধীন এসব মামলায় আদায় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। ২০২১ সাল শেষে অর্থঋণ আদালতে ৬৮ হাজার ২৭১টি বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আটকে ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। বিচারাধীন এসব মামলায় ওই সময় আদায় হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার। আর এর বিপরীতে আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২২ সাল শেষে দেশের ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ৭০২টি মামলার বিপরীতে ১১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা আটকে রয়েছে আদালতে। ২০২১ সাল শেষে মামলা ছিল ৩ হাজার ৯১৯টি ও এর বিপরীতে আটকে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৫১৮ কোটি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ৭৮৩টি। এসব মামলার বিপরীতে গত এক বছরে ৩ হাজার ৩৪ কোটি টাকার দাবি বেড়েছে।