লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নে বাসিন্দা সাহিনা আক্তার। রাজধানীর মগবাজার এলাকায় দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। সরকারি চাকরিজীবী স্বামী আবদুল ওয়াদুদ ২০২০ সালে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। স্বামীর পেনশন থেকে প্রাপ্ত অর্থসহ সারা জীবন জমানো প্রায় ৩০ লাখ টাকা বেসরকারি খাতের তিনটি ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে (এফডিআর) রেখেছিলেন। এফডিআরের লভ্যাংশ আর নিজের টিউশন পড়ানোর টাকায় সংসার চালাতেন তিনি। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সম্প্রতি তিনটি টিউশনের একটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তাকে। এমন পরিস্থিতিতে বাসা ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়ায় খরচ আর সংসারের খরচ বৃদ্ধির কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারি একটি ব্যাংকের এফডিআরের ১০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন। সেই টাকা দিয়েই ছোট ছেলের সেমিস্টার ফি আর অন্যান্য খরচ বহন করছেন তিনি।
শুধু সাহিনা আক্তারই নন, রাজধানীতে বসবাস করা আক্তার হোসেন, তারিকুল ইসলামসহ স্বল্প আয়ের অনেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়টাতে সংসার খরচের ব্যয় সামাল দিতে ব্যাংকে জমানো টাকা তুলে নিচ্ছেন। এতে ব্যাংকের টাকা চলে যাচ্ছে মানুষের হাতে। আর ব্যাংকে দেখা দিচ্ছে তারল্যের সংকট। এক বছরের ব্যবধানে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশে নেমে এসেছে।
জানতে চাইলে সাহিনা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকের এফডিআরের লভ্যাংশ আর আমার টিউশন থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই আগে সংসার কোনোরকম চালানো সম্ভব ছিল। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আমার একটা টিউশন বন্ধ হয়ে যায়। আর সব পণ্যের এতটাই বেড়েছে যে, সংসার খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভাঙতে হয়েছে।’
ধারাবাহিক ঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংক নিয়ে গুজবসহ নানা কারণে গেল বছরের শেষদিকে অনেকেই ব্যাংক খাত থেকে আমানত তুলে নিয়েছিলেন। এর বাইরে ব্যাংকে আমানতের সুদহার কমে যাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন কারণে গ্রাহকদের সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকের পরিবর্তে হাতে রাখার প্রবণতা বেড়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের মে মাসে ব্যাংক খাতের বাইরে মানুষের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মে শেষে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে মানুষের হাতে টাকা চলে গেছে ৩০ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা বা ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অবশ্য সরকারকে ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭৮ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছে। এটিও মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিয়েছে।
তবে ঋণ কেলেঙ্কারি রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি ও হাতে টাকা রাখার ঝুঁকি বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে কিছু অর্থ ব্যাংকে ফিরেছে। তবে তা এখনো আগের বছরের তুলনায় কম।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের শেষদিকে ব্যাংক খাতের বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারির বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এতে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থার সংকট দেখা দেয়। বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে পারছে না। পাশাপাশি ব্যাংকে টাকা রাখলে পাওয়া যাবে না গুজব ও মূল্যস্ফীতি ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক থেকে মানুষ টাকা তুলে নেওয়া শুরু করে। তবে ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে অনেক গ্রাহকের মাঝে ধীরে ধীরে ব্যাংকের প্রতি আস্থা আবারও তৈরি হচ্ছে। তারপরও অনেক গ্রাহকের মনে ‘আস্থার ঘাটতি’ এখনো রয়েই গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ব্যাংকে টাকা রাখা নিয়ে রীতিমতো দোটানায় পড়েছেন। কোনো কোনো গ্রাহক এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করছেন। বিশেষ করে শরিয়াহ আইনে পরিচালিত ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকা তুলে সরকারি কিংবা বিদেশি ব্যাংকে রাখছেন। আর নেহাত যাদের ব্যাংকের ওপর আস্থা কম, তারা টাকা তুলে হাতে রাখছেন। এ কারণেই ব্যাংকের বাইরে টাকা বেড়ে গেছে।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জয়তুন বিজনেস সলিউশনসের চেয়ারম্যান মো. আরফান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকের বাইরে টাকা চলে যাওয়া ভালো নয়। এটা ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি করতে পারে। এটি হয় দুই কারণে; প্রথমত দেশে যদি দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। তখন মানুষ সংসার চালাতে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখার চেষ্টা করেন। আর দ্বিতীয়ত, যদি ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ মনে না করেন তাহলে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এ ছাড়া আমানতে সুদের হার কম থাকলেও মানুষ টাকা ব্যাংকে না রেখে অন্য খাতে বিনিয়োগ করার চেষ্টা করেন।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চলতি বছর এপ্রিল শেষে মানুষের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। আর মে মাসে এ অর্থ কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে মাসের ব্যবধানে মানুষের হাতে রাখা অর্থের পরিমাণ কমেছে ৭ হাজার ৫৪৩ কোটি বা ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত বছর জুনে ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৮ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন আরও বলছে, ২০২১ সালের জুন মাসে ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বেড়েছিল ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। ২০২২ সালের জুনে হাতে টাকা রাখার প্রবণতা আরও বেড়েছে। এ সময় হাতে টাকা রাখার পরিমাণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ।